দ্বীপ সরকার এর ৫টি কবিতা
আয়নাদৃশ্য
আমি উলঙ্গ হয়ে তোমার কাছে হাজির হয়েছি হে ঈশ্বর
কোন রকম ভণিতা ছাড়াই——
অপরুপ জন্মদৃশ্যে এসেছি তোমার সকাশে,
তুমি চোখ মেলে দেখো
আজ আর সূতি লুঙ্গি,বা ধূতি——কিছুই নেই
এর আগে মায়ের গর্ভে থেকেছি কিছুদিন, কিছুপর্ব সময়
ওখানে শরীর ঢেকে রেখেছিলো কি দিয়ে
তা মা’কে কোন দিন জিজ্ঞেস করিনি|
এখন অনেক পোশাক——আলখাল্লা, টুপি, প্যান্ট, গেঞ্জি
নিচে, ছোট অঙ্গের জন্য খুপড়ি ঘরের মতোন পেন্টি
একদিন আয়নায় দাঁড়ালাম, শেষ দুপুরে
এই সময়ে নাকি আয়না নিজেও উলঙ্গ হয়
দর্শক যা চায়, তাই দেখায়——
দেখি, আমার চোখদুটো হাট হয়ে আছে
শ্যামলা রঙের হাতদুটো গর্দানের অদূরে ঝুলে আছে
এরপর, মুখ, কান, নাক——সব, যে যার মতো, হাট হয়ে আছে
তুমি তো জানো ঈশ্বর——আমার পুনর্জন্মের ইতিহাস,
আমি তো ছিলাম বাগান্ডা জনগোষ্টীর,
এরপর আসলাম প্যাসিফিক দ্বীপপুঞ্জে,
সামোয়া এবং টোঙ্গা পরে থেকেছি এক কোটি বছর——
তখন কোন আয়না ছিলো না
গাছের ছালকে আয়না বানিয়ে দেখেছি নিজেকে
হে ঈশ্বর—
আজকে আর লুকোচুরি নেই
একটাবার দেখো, আমার ভেতরে গোলাপ ফুটে আছে
আমার ভেতর একটা আয়না আছে বৈকি!
মা ও পাতাবাহার
মা, আমার এখনো বেঁচে আছেন
তবে পাতাবাহারের মতোন সুন্দরে নয়——
মা এখন অসুখ—বিসুখের রানী
আগে, মা যখন পাতাবাহার ছিলেন
তার চোখ মুখ ছিলো বাগিচার মতোন রঙ্গিন
মুখে ঘোমটা পড়লে——পাতারা ফিকে হয়ে যেতো
আবার যখন হাসতেন,
পতাগুলো খড়কুটোর মতোন উড়তো
মা যখন দরদ ভরে ডাকে আমাকে——
“বাবা মুখ তোর কালো হয়ে গেছে
তুই বোধয় খাসনি কিছু”
আমি তখন ক্যালাডিয়াম হয়ে যেতাম
ক্যালাডিয়াম মুলতঃ বনভূমির হাসির নাম
মা আর আগের মতোন হাসতে পারেন না
এ্যজমার টান বেশি হলে,
সেদিন আর পাতাবাহার হাসে না
একদিন মা’র ভীষণ টান বেড়ে যায়
দুপুরের রোদ, চিকচিক করছে
জানালায় তাকিয়ে দেখি——
বাগানের ক্যালাডিয়ামটা ফেস্টা হয়ে যাচ্ছে
বসন্ত ও উত্থানের গল্প
যে ডালে পাতা নেই——
ডালসর্বস্ব হরিণের মতো মেলে ধরে আছে শিং
গতকাল যে মেহগনি ছিলো মরা লাশের মতোন
আজ সকালে হাঁটতে দেখি
ঘোমটা খুলতে শুরু করেছে তারা
ডালে ডালে ভরে যাচ্ছে লাইলি মজনুর হাসি
আজ লিখবো, ঘোমটা খোলার গল্প——
বিকেল নামছে এদিক সেদিক
পার্কে ভিড় করছে প্রজাপতিরা
বালিকাদের খোঁপায় বাগান চড়ে বেড়াচ্ছে দেখার মতো
নব দম্পতিরা,পার্কের যে পাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার,
সেখানে আলোকিত করে তুলছে,জাঁকজমকপূর্ণ——
শর্ষের ভাষার পাঞ্জাবি আর শাড়ী
পাতাবাহার হয়ে ঝলকাচ্ছে খুব
উঠতি বয়সী বলিকারা জেনে যাচ্ছে
প্রজাপতি হওয়ার গোপন কৌশল
ওদের সামনেই নকশা খচিত একজোড়া প্রজাপতি
কিরুপ লজ্জা হরাচ্ছে!
ঠাঁটে ঠোঁটে উড়ছে লজ্জাবতী ফড়িং!
বসন্তের কোন শরীর নেই, জানি
তবু নর—নারীতে কিভাবে ঢুকে যায় তারা!
যুবতীদের হাসিতে প্রজনন জমা রেখে
দৌড়ে পালিয়ে যায় হলুদ ফড়িং
উঠতি বয়েসী চোর
ফুলদোকানে আমি গাঁদা নিচ্ছি চারটি
একটি আমার, আর তিনটি তিন বন্ধুর
কোত্থেকে এক জলপাই রঙের চোর
হাওয়া হয়ে এসে গাঁদাগুলো কেড়ে নিয়ে চলে গেলো
গোটা শহর তন্নতন্ন করে খুঁজেছি——
মাটিডালি মোড় থেকে বনানী
সাতমাথার ওলিগলি, মার্কেটের ঘুঞ্জি ধরে ধরে
চোরের গায়ের রং হালকা বাদামি
নিঃশ্বাসের ভেতর হাঁটে সাদা সাদা রপোর কয়েন
চোরটি যখন খপ করে ধরেছিলো ফুলের তোরণ
তখন সেই সাদা কয়েন দেখেছি——
অদ্ভূদ ঢঙে হেলে দুলে উড়ে যাচ্ছে বাতাসে
চোরের চোখে যখন চোখ পড়েছিলো একবার
দেখি, তার রাক্ষুসে চোখের ভেতর আমার ছায়াটা দৌড়োচ্ছে
আমার গাঁদাযুক্ত হাত, তবু একটুও কাঁপেনি
চোরটি সবে সাবালিকা শিখে, এ শহর ও শহর উড়ছে
ঠোঁটে লাল টুকটুকে চাকুর জব্বর বাহাদুরি
এই চাকু নিয়েই যত বাহাদুরি তার
যা খুশি, যাকে খুশি——চুরি করে নিয়ে যায়
বাংলা একাডেমি ও একজন মোহন রায়হান
বাংলা একাডেমি নিজ গর্তে ঢুকে পড়েছে——
একবার সাহস করে উচ্চারণ করেছিলো ——“মোহন রায়হান”
মোহন রায়হান কবি, অথবা অকবি
তিনি কি লিখেছেন বা লিখবেন
এই তর্কের ভেতর বহু হাঁটা যেতে পারে
এই তর্কের ভেতর, কোনটা ফুল কোনটা কাঁটা
এ নিয়ে তুমিও কম হাঁটোনি
হেঁটেছিলে বলেই তো সাহস করে বলেছিলে—— “মোহন রায়হান”
যেখানে প্রশ্ন, সেখানে সমাধান নেই
যেখানে আবার উত্তর, সেখানে প্রশ্ন নেই
এই দুইয়ের পরস্পর সম্পর্ক নিকতম বন্ধুর মতোন
রক্ত নেই, কিন্তু প্রেম আছে
কিসে প্রেম কিসে বসন্ত——তোমরা সব জানো
জানো বলেই তো, রফাদফা করতে চেয়েছিলো
এক প্রকার ব্যাঙ আছে——খরায় লুকিয়ে যায়
বর্ষায় ফের জমিন ফাটিয়ে জেগে ওঠে
এক প্রজাতির পুরস্কার আছে
জমিন ফাটিয়ে মাথা বের করে—— ফের লুকিয়ে যায়
শুনেছি, মোহন রায়হান মরেননি
তার সম্মান মরেছে——একেবারে টুকরো টুকরো করে
তার সম্মানকে হত্যা করেছো তোমরা
এই হত্যার অধিকার কি তোমার আছে?
কবির কবিসত্ত্বা মরে না——
তার মগজে এখনো দিবালোকের মতো চকচকে কবিতা আছে
মাথায় সাদা কালো, সারিবদ্ধ, চুলবৃক্ষ এখনো দাড়িয়ে আছে
চোখের ভেতর স্বপ্নগুলো,
উর্দি পড়া আর্মির মতো টক টক করে হাঁটছে
কবিরা মরে কি?
বংলা একাডেমিরা মরে যায়
বার বার মরে যায়—— মরে গেছে বহুবার
পরিচালক, কুশিলবরা অনেকবার মরেছে
শুনেছেন কখনো হে, শ্রোতা মন্ডলী
এই প্রতিষ্ঠানের কখনো শিরদাঁড়া ছিলো?
আরো পড়ুন...
মাটির হেঁসেল পড়ুন এখানে
উপসচিব ও অন্যান্য কবিতা পড়ুন
ছবি ব্লগ কিস্তি ২ এখানে
জুবিলিদের পাশের বাড়ির মেয়েটি পড়ুন এখানে
কবিতা উপসচিব ও অন্যান্য পড়ুন এখানে
অন্ধ আয়নার গল্প পড়ুন এখানে
মেডিকেল ও কাঁটাপাথর এখানে পড়ুন
গোলাম কিবরিয়া পিনু'কর্মকান্ড নিয়ে বিন্তর আলোচনা পড়ুন
৫টি কবিতা পড়ুন এখান
সোনালী কাবিন পাঠ আলোচনা এখানে
পাঁচটি কবিতা পড়ুন
ঝাউপাতার ঝাঁপতাল এখানে পড়ুন
ছবি আর্কাইভ ১ দেখুন
দেহখানি তার চিকন চাঁদ এখানে

0 মন্তব্যসমূহ
ধন্যবাদ আপনাকে