গোলাম কিবরিয়া পিনু'র কবিতায় জাতিবোধ, মুক্তিযুদ্ধ ও দ্রোহের সম্মিলন।। article about golam kibria pinu || দ্বীপ সরকার আর্কাইভ

 

দ্বীপ সরকার।। কবি

গোলাম কিবরিয়া পিনু'র কবিতায় জাতিবোধ, মুক্তিযুদ্ধ ও দ্রোহের সম্মিলন

দ্বীপ সরকার

বাংলা কবিতার বিস্তৃত পরিসরে গোলাম কিবরিয়া পিনু এমন একজন দক্ষ কবি, যাঁর কাব্য চর্চায় জাতিসত্তা, ইতিহাসচেতনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য অনুষঙ্গ বারবার বিভিন্ন দৃশ্যকল্প হয়ে ধরা দিয়েছে। সেই দৃশ্যকল্পগুলো নিছক ব্যক্তিগত নয় বরং তা ক্রমশ রূপ নিয়েছে সামষ্টিক অভিজ্ঞতায়। তাঁর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে জাতিবোধ এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ফলে তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে একদিকে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, অন্যদিকে সংগ্রামী ইতিহাসকে জাতির কাছে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া। তাঁর কবিতায় কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, নদীপাড়ের জীবন—সবকিছুই এক ধরনের শেকড়—সচেতনতার ইঙ্গিত বহন করে। যেখানে আবহমান গ্রামবাংলার ‘মাটি’, ‘নদী’, ‘ধানক্ষেত’, ‘গ্রামবাংলা’—এসব প্রকৃতির চিত্র ফুটে উঠেছে। তবে এই বিষয়বস্তু তাঁর কবিতার মুল সুর নয়। তিনি গ্রাম বাংলার রুপ মাধুর্য়ে যতটা মাতোয়ারা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি মাতোয়ারা মানবিক মুল্যবোধ, মানবিকতা,বাঙ্গালি জাতিয়তা,জাতিবোধ এবং আত্মপরিচয়ের নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। এই বিষয়গুলো সবসময় কবিকে দগ্ধ করেছে। এগুলোই তাঁর কবিতার মুল প্রতিপাদ্য বিষয়। তিনি সব সময় বোঝাতে চেয়েছেন, জাতি বলতে শুধু রাজনৈতিক সীমানা নয়; বরং একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যাত্রা, যা মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। জাতি বলতে ৭১, জাতি বলতে মুক্তিযুদ্ধ—এর বাইরে আর কিছু থাকতে পারে না।

বাংলাদেশ মানেই মুক্তিযুদ্ধ এক চিরন্তন ও অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ তাঁর কাছে শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং তা বাঙালির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ প্রকাশ। তাঁর কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহুমাত্রিকভাবে উপস্থিত হয়েছে। কখনো তা রক্তাক্ত ইতিহাস, কখনো বেদনার্ত স্মৃতি, আবার কখনো বিজয়ের গৌরবগাথা। কবি মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং নির্মমতাকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেন। তাঁর কবিতায় শহীদের রক্ত, মায়ের কান্না, ধর্ষিত নারীর আর্তনাদ, শরণার্থীর দুর্ভোগ—এসব চিত্র পাঠককে নাড়িয়ে দেয়। তবে তিনি কেবল শোকের বর্ণনাতেই থেমে থাকেন—সেটা নয়, বরং এই বেদনার মধ্য দিয়েই তিনি খুঁজে পান প্রতিরোধের শক্তি। মুক্তিযুদ্ধ মানেই স্বাধীনতার প্রশ্ন এবং এই স্বাধীনতার প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে আছে জাতি ও জাতিবোধের চরম ঠিকানা।

কবির অসংখ্য কবিতা এই বিষয়ভাবনাগুলো নানাভাবে চিত্রিত হয়েছে। যেমন এক কবিতায় বলেন,

“এখন আমার বর্শা নেওয়ার সময়
এই হাতে আছে শক্ত জোর
খুলতে পারি দোর—
লক্ষ্য করে বক্ষ তার ছিদ্র করা চাই।”
(বর্শা,নির্বাচিত কবিতা)

কবি যেনো এখনো ৭১ এ আছেন। ৭১ এর অস্থিরতা, শোষণের বিরুদ্ধে কবি আহবান করছেন। কবি বলতে চান, আমাদের চেয়ে চেয়ে দেখার দিন শেষ। আমাদের এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। আমাদের এখন অস্ত্র হাতে নেওয়ার সময়। এখানে বর্শা একটি নিছক ছোট অস্ত্র নয় বরং সকল প্রকার সামরাস্ত্রের প্রতীক হয়ে উঠেছে। পরে লাইনে কবির যৌবনদীপ্ত সময়কে দারুণভাবে ফুটে তুলেছেন। বৃদ্ধ বয়সে শরীরে জোর কম থাকে। তাই কবি বলছেন, ‘এই হাতে আছে শক্ত জোর/খুলতে পারি দোর—’। এখানে দোর বলতে কবি যুদ্ধজয়ের ইঙ্গিত দিয়ে বলতে চেয়েছেন,আমরা চিরদিন আবদ্ধ থাকবো না। এখনই উপযুক্ত সময় বর্শা হাতে নেওয়ার। আবার এই পঙক্তির ভাষা চলমান সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকেও ইঙ্গিত হতে পারে। সমসময়ে লক্ষ্য করা যায়, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অনেক অসূর মাথা চারা দিয়ে উঠেছে। কবি তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র বা বর্শা হাতে আহবান করতে পরেন।

এখানে একটা কথা বলা দরকার, গোলাম কিবরিয়া পিনু মুলত সরলভাষ্যের কবি। কবির কাব্যভাষা থাকে পরিস্কার। কবিতার সামনে দাঁড়ালে আয়নার মতো চমকিত হয় পাঠক। চিন্তা ও দর্শণ তার প্রত্যেকটি কবিতা পাঠককে গভীরে প্রোথিত করে। অতি অলংকার নয়, বরং কবিতার ভাব ও ভাষা এতই সুগভীরের ফুল যে, তা অতলে থেকেও স্পষ্টত সুগন্ধি ছড়ায়। এটাই কবির কাব্যের স্বতন্ত্রতা। কবি অন্য আরেক কবিতায় একই সুর তুলেছেন অন্যভাবে।

“মারণাস্ত্রের সময়কাল
আগামীর মহুর্তগুলো কীভাবে কাটাবো?”
(বিপন্ন অস্তিত্ব,নির্বাচিত কবিতা)

কবি এই পঙক্তিতে ভয়ংকর এক সময়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এই সময়টা খুব মারণাস্ত্রের সময় যাচ্ছে। ভারত—পাকিস্থান, আমেরিকা—ইরান, পাকিস্তান—আফগানিস্থান, মধ্যপ্রাচ্য—দিকে দিকে মিসাইল, ড্রোনের শব্দ কানে ভাসছে। কবি শঙ্কাবোধ করছেন, অনতিভবিষ্যতে আমাদের সময়টা কেমন যাবে। এই সময়ে বল্লম নয়,বর্শা নয়, আগামীতে আমাদের এভাবেই মারণাস্ত্রের মতো করে প্রস্তূতি নিতে হবে।

কবির সাথে আমার ব্যক্তগত পরিচয় নাই বললেই চলে। তবে বগুড়া লেখকচক্রের কোন এক প্রোগ্রামে তার সাথে একবার দেখা এবং যৎসামান্য কুশল বিনিময়। তা থেকে বুঝেছি তিনি একজন খুব সজ্জন, স্বল্পভাষী এবং পরিচ্ছন্ন মানুষ। তিনি অনেকটা গম্ভীর এবং চিন্তক। এছাড়া সোস্যামিডিয়ায় কবির এ্যাক্টিভিজম আমাকে ভাবায়। চলমান অস্থিরতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, মুক্তিযুদ্ধবিরুদ্ধ কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে তাঁর কলম সচল। কখনো স্ট্যাটাস বা কবিতা পোস্টে কবি তার ভেতরের কান্না এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন,করছেন। এই ভাবনাগুলো কবিকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়। কবি জাতিকে জাগ্রত করতে চান। জাতি যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। তার অসংখ্য কবিতায় এই জাগরণ পরিলক্ষিত হয়। যেমন কবি বলেন,

“সাইরেন বাজানোর সময় এখন
কোনো শিথিল শৈথিল্য থাকতে পারে না
জাগরণ কাকে বলে, তাই দরকার
উন্মোচন কাকে বলে, তাই দরকার
উন্মীলন কাকে বলে, তাই দরকার।”
(সাইরেন,নির্বাচিত কবিতা)

কবিতার ভাষার মধ্যে কোনো সাজুগুজু নেই। তবে দ্রোহ আছে। ঘুমন্ত জাতিকে সাইরেন বাজিয়ে জাগ্রত করতে চান। কেমন জাগ্রত দরকার, কেমন উন্মোচন দরকার—ততটুকুই সাইরেনের ধ্বনিতে ধ্বনিত করতে চান কবি। এই ঘুম এবং জাগরণ, কোনো নিছক বিষয় নয়—সবকিছুতে মুক্তিযুদ্ধ চেতনার জাগরণ। কবি কখনো সেখান থেকে ছিটকে যান না। আরেকটি কবিতায় বলছেন এভাবে,

“আমাদের আবার দাঁড়াতে হবে
এইখানে
একাত্তরে—
কতটুকু রক্ত ছিল যুদ্ধে ?
কতটুকু কান্না ছিল যুদ্ধে ?
কতটুকু দুঃখ ছিল যুদ্ধে ?
কতটুকু পণ ছিল যুদ্ধে ?
কতটুকু ত্যাগ ছিল যুদ্ধে ?
কতটুকু আশা ছিল যুদ্ধে ?
কতটুকু স্বপ্ন ছিল যুদ্ধে ?”
(এইখানে,নির্বাচিত কবিত)

কবি জাতির নিকটে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলতে চান, আমরা যা করেছি, যা করছি, যতটুকু বিপথে চলে গেছি, যতটুকু ভ্রান্তি বিভ্রান্তিতে আমরা নিপতিত হয়েছি, সেখান থেকে সরে এসে আমাদের সেই একাত্তরের কাছেই দাঁড়াতে হবে। কবি ‘এইখানে’ শব্দ ব্যবহার করেছেন সুচিন্তিতভাবে—যেনো একটা গোল চিহ্নিত বুত্ত এঁকে বলছেন—এই সুদির্নিষ্ট স্থান থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। এটাই আমাদের আসল ঠিকানা। “এইখানে’ মুলত ৭১ এর প্রতীকি স্থান—যেখান থেকে বিচ্যুতি মানে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া। এখানে রক্তের প্রশ্ন আছে, কান্নার প্রশ্ন আছে—এভাবে দুঃখ,পণ, ত্যাগ,আশা,স্বপ্ন। কবি সতর্ক করতে চান, ৭১ ভুলিয়ে যাওয়া মানে শহীদদের রক্ত, দুঃখ—কষ্ট, তাদের ত্যাগ এর সাথে বেইমানি করা।

কবির কবিসত্তাজুড়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং শেখ মুজিবকে ঘিরে। মুক্তিযুদ্ধকে শয়নে স্বপনে লালন করেন বলেই তাঁর সমগ্র কবিজীবন একটা বোধিবৃক্ষের দিকে ঝুঁকে আছে। মুক্তিযুদ্ধ এবং শেখ মুজিব— একই সূত্রে এবং  একই অঙ্গের দুটি শাখা। স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের নাম ধরলে স্বাভাবিকভাবেই মুজিবের নাম এসে যায়। কবির কিছু কবিতা আছে, যেখানে মুজিবকে কেন্দ্রে রেখে, কখনো মুক্তিযুদ্ধের নায়কের চরিত্রে, কখনো বীর চরিত্রে, কখনো মুক্তিকামী জনগণের চরিত্রের প্রতিভাষ হয়ে উঠেছে । বিভিন্ন চিত্রকল্পে এবং রুপকের মাধ্যমে তা হয়ে উঠেছে ব্যঞ্জনার সুর। যেমন একটি কবিতা এরকম,

“শিশুর অবোধকালের সঙ্গে মুজিবের নাম
উচ্চারিত হয়েছিলো স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়
সেই শিশু বড় হয়ে দেখে
মুজিবের নাম কেড়ে নেওয়া হচ্ছে কণ্ঠস্বর থেকে
সেই সঙ্গে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে
তারুণ্যের স্বপ্ন”
(মুজিবের রক্তধারা, নির্বাচিত কবিতা)

এখানে মুজিবের শিশুকালের চরিত্র এসেছে এবং সেই সঙ্গে এসেছে তাকে ভুলে যাওয়ার হীনতার বিষয়। চারদিকে মুজিবকে ভুলিয়ে রাখার আয়োজন, যেনো কণ্ঠস্বর থেকে কেড়ে নিতে চায় তার নাম। একই কবিতায় অন্য এক জায়গায় কবি বলছেন—

“মুজিবের নাম শুনে কারা ভয় করে
যারা পরজীবী বণিকের সহযোগী হয়ে
শিকেয় রক্ষিত ঘি পাচার করে দিচ্ছে অন্য হাতে।”
(মুজিবের রক্তধারা,নির্বাচিত কবিতা)

কবি রাখঢাক রেখে কথা বলতে রাজি নন। মনে হতে পারে, মনে যা আসে তাই বলেন। কিন্তু কখনোই কবিতার ব্যঞ্জনা থেকে ছিটকে যান না। এটাই কবির ভিন্নতা। প্রসঙ্গত, এই পঙক্তির দিকে চোখ রাখলে বোঝা যায়— মুজিবের নাম শুনে তারাই ভয় করে, যারা চরিত্রহীন এবং শঠ। এর উপমা টেনেছেন এভাবে, বণিকের সহযোগী হয়েও যারা গোপনে অন্যপথে রক্ষিত পণ্য পাচার করে। এখানে ‘রক্ষিত ঘি’ মুলত ব্যবসায়িক পণ্যের প্রতীক হলেও বিষয়ভাবনা কেবল সেখানেই আবদ্ধ থাকেনি। ‘রক্ষিত ঘি’ চোরাপথে অন্যায়ভাবে পাচার মানে সমষ্ঠিগতভাবে চরিত্রহীনদের মুখোস উন্মোচনের প্রতীকী ব্যবহার। তাই কবি বলতে চান, এ রকম চরিত্রহীন যারা, তারাই মুজিবের নাম শুনে ভয় পায়। অন্য আরেকটি কবিতার পঙক্তি এ রকম,

“সাতই মার্চের জনসভার মঞ্চে-উঠবার আগে
আমাদের মুজিব—
কত শত সভার মঞ্চে উঠেছেন দৃঢ় পায়ে?
(অনিবর্য সাতই মার্চ,ওখানে আমার পছন্দের কেউ নেই)

সাতই মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা অবিস্মরণীয় ঘটনা। এই কবিতা হতে পারে এই দিনটিকে জাতির মননে মস্তিস্কে ধরে রাখার চমকপ্রদ উপাদান এবং দলিল। কবি সেই দিনের স্মৃতি, মনে করিয়ে দেন জাতিকে। জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, সাতই মার্চের দিনে সভামঞ্চে মুজিব যে দৃঢ়চিত্তে পা উঠিয়েছিলেন, কোনরুপ ভয়হীনভাবে—সে রকম অতীতে আর কোন সভামঞ্চে পা উঠিয়েছিলেন কি না? আরো একটি কবিতায় কবি বলছেন——

“আমরা তখন হিম—চাদরে যেন ঢেকে যাচ্ছিলাম
গিরিসংকটেও ছিলাম
এর মধ্যে থেকেও—পাকিস্থানি শাসক ও বণিকেরা আমাদের
জোর করে টেনে তুলে নিয়ে
নিলামে তুলছিলো!
আমাদের বদ্বীপ—দীপহীন হয়ে গেলো!
আলোহীন হয়ে
ঘুটঘুটে সময়ে—
আমরাও নিমজ্জিত হই!
সেইসময়ে সমুদ্রের তল থেকে এসে
শিলা ও বরফ ভেদ করে
আমাদের পাশে দাঁড়ালেন--
তামা গলানোর এক সাহসী মানুষ!”
(বঙ্গবন্ধু,ওখানে আমার পছন্দের কেউ নেই)

এখানে স্বাধীনতা উত্তর সময়ের যে চালচিত্র—পাকিস্থানিদের শোষণ, নৈরাজ্য,ব্যবসায়িক সুবিধা, তার আবহ তৈরি করেছেন। এবং এই সময়কে একটা অন্ধকার ঘুটঘুটে, চারদিকে হিম,গিরিসংকটময় সময়ের সাথে তুলনা করে বলছেন, ‘আমরা তখন হিম—চাদরে যেন ঢেকে যাচ্ছিলাম/ গিরিসংকটেও ছিলাম’। সময়টাকে এমন একটা ঘোরময় অনুরণনে বর্ণনা করছেন যে, এমন সময়ে একজন সাহসী মানুষের প্রয়োজন হয়ে উঠেছিলো—যিনি এই অন্ধকার থেকে উদ্ধার করতে পারেন। কবি যেনো গভীর স্বপ্নে নিমজ্জিত এবং ঘুম থেকে জেগে দেখেন— সত্যি সত্যি এক মহা নায়ক “সমুদ্রের তল থেকে এসে/শিলা ও বরফ ভেদ করে/আমাদের পাশে দাঁড়ালেন-”। “বঙ্গবন্ধ” কবিতাটি একটি সিম্বলিক কবিতা—কবিতার ভেতর একটা নীরব চরিত্র আবিস্কার করেছেন-তিনিই বঙ্গবন্ধু।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন আমাদের বিদ্রোহী এবং দ্রোহের কবি। যদিও এই একটি বা দুটি গুণে তাঁকে বেঁধে রাখা যায় না। তিনি বহু গুণের কবি। তবে বিদ্রোহ এবং দ্রোহ তাঁর মস্তিস্কে যেভাবে অটোমোশনের মতো কাজ করেছে, তা আর অন্য কবির মধ্যে পাওয়া যায় না। নজরুলের “বল বীর—/চির উন্নত মম শির”,“কারার ঐ লৌহ কপাট/ভেঙ্গে ফেল,কর রে লোপাট”। নজরুলের এ রকম জাতি জাগরণের অসংখ্য কবিতা গান আছে যা বৃটিশদের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো। এগুলো সরাসরি যুদ্ধের ডাক এবং জনগণকে যুদ্ধে অংশ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছে। এ রকম রফিক আজাদের “ভাত দে হরামজাদা/তা না হলে মানচিত্র খাবো” কবিতা জাতিকে যুদ্ধের দিকে টানেনি কিন্তু তৎকালিন সরকারের গদিতে কাঁপন লেগেছিলো ঠিকই। কবি গোলাম কিবরিয়া পিনু টোটালি সে রকম একজন দ্রোহের কবি। তাঁর কবিতার রাস্তা ধরে হাঁটলে বোঝা যায় তাঁর কবিতাশক্তি একটা মসনদ ভেঙ্গে দেবার মতো কিরুপ অটোমোটেড হয়। অন্তরে এবং দৃষ্টিতে যাঁর লেলিহান অগুন। এই আগুন কখনো মুক্তিযুদ্ধ, কখনো চলমান অস্থিরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। এখানেই মুলত জাতিবোধের প্রশ্ন এবং বাংলাদেশ দেখার পদ্ধতির প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। এখানেই কবির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান স্পষ্ট।

এ রকম কিছু কবিতার উদ্ধৃতি তুলে ধরছি——

আমার দু’পা আছে ভুলে গেছি
আমার উঠোনে হাঁটতে পারি না
নিজের শস্যের মাঠে যেতে পারি না
নিজের দেশের রাজনীতিতে যেতে পারি না
বছরের পর বছর
আমার পা দু’টো বেঁধে রাখা হয়েছে
আমার হাতেও বেড়ি!
(জন্মের পর থেকে কারাগারে, ঝুলনপূর্ণিমা থেকে নেমে এলো)
হাতঘড়িতে শরৎ নেই—
সূর্যঘড়িতে কি আছে?
শরৎ এখন রাঘববোয়ালের কাছে!
মাঠের পর মাঠ
যেখানে দুলতো কাশবন
যেখানে খুলতো—
মা—বোনের বেণী!
সেখানে এখন দখলবাজির
ট্রাক ও দেওয়াল তোলার ছেনী
(শরৎ, ঝুলনপূর্ণিমা থেকে নেমে এলো)

যাকে তাকে স্টিয়ারিংয়ে বসাই কেন?
সে তো বাড়ি না পৌঁছে দিয়ে
পৌঁছে দিচ্ছে মর্গে!
(স্টিয়ারিং, ঝুলনপূর্ণিমা থেকে নেমে এলো)

এতদিনেও আমার কাছ থেকে
কবিতা কেড়ে নিতে পারেনি কেউ।
(কবিত, ঝুলনপূর্ণিমা থেকে নেমে এলো)

দেশটা কি মগের মুল্লিক হয়ে গেল?
যে কেউ এসেই—
থামিয়ে ট্রাক
চলাচল বন্ধ করে দেয়
(মগের মুল্লক, ঝুলনপূর্ণিমা থেকে নেমে এলো)

এ ছাড়াও অসংখ্য কবিতা ছড়িছিটিয়ে আছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়, ম্যাগাজিনে, সোস্যালমিডিয়ায়— যেখানে কবি আঙ্গুল উঁচু করে বিদ্রোহ পোষণ করেছেন। তাঁর কবিতার ভাষা স্পষ্ট তবে অত্যান্ত শক্তিশালী। কবির চিন্তা যখন স্পষ্ট হয়, কবির অবস্থা অবস্থানও স্পষ্ট হয়। কবি যখন দ্রোহী হয়ে ওঠেন, তখন তাঁকে পরিস্কার করে তোলে এক প্রকার স্ফুলিঙ্গের আলো। সে স্ফুলিঙ্গ সব কিছু পুড়ে অঙ্গার করে দেয়। কিছু কবিতা আছে যেগুলো বারুদের মতো—বিস্ফোরিত হলে, স্প্রিন্টার আর ধূম্রজ্বালে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় সবকিছু।

“কেউ যদি আমাকে সাহায্য করে নিজের ইচ্ছায়
কিংবা আমন্ত্রণ করে তার ঘরে যাওয়ার
তা আমি গ্রহণ করেছি—কখনো কখনো সহাস্য বদনে!
এরপর যদি সে ভাবতে থাকে—আমি পিঠমোড়া হয়ে পড়ে আছি
তার ঠেলাগাড়িতে!
ইজারা দিয়েছি আমাকে পুরোটাই!
তা হলে তা হবে মস্ত বড় ভুল!”
(আহম্মকের স্বর্গে কোন আহম্মক, ওখানে আমার পছন্দের কেউ নেই)

এখানে অস্তিত্ববাদের আবহ বিরাজমান। এই পঙক্তিগুলো কবির ব্যক্তিকেন্দ্রিক—তবে তা সমাজে টিকিয়ে থাকার জন্য নীরব হুংকার। কখনো সখনো এমন ঘটে যায় জীবনে, মানুষ সুযোগ গ্রহণ করে। কিন্ত কবি বারুদের স্প্রিন্টারের মতো বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন এভাবে, আমাকে কাউকে ইজারা দেইনি। যদি এমনটি কেউ ভাবে—তা হবে মস্ত বড় ভুল। এখানেই অস্তিত্বের আলোর সন্ধান পাওয়া যায়। আবার এখানে পুজিবাদ এবং সুবিধাবাদীর ধারণাও স্পষ্ট। কবির লালিত দৃষ্টির ভেতরে যে উত্তাপ, যে হুংকার, তা এই পুঁজিবাদী এবং সুবিধাবদীদের মসনদে আঘাত হানবে। অন্য আরেক কবিতায় বলছেন,

“সুবিধাভোগীরা অতিরিক্ত সুবিধা নিয়ে যে
স্বাধীনতা ভোগ করছে—তাতে মনে হয়,এদের
পূর্বসূরিরা ওদের জন্য এদেশটা তৈরি করেছে।”
(মুক্তিযোদ্ধার অশ্রুপাত, জামাটা পাল্টাও, অন্তর্বাসও)

এখানে কবিতার বিষয়ভাবনা খুব পরিস্কার। কবির বোধের জায়গাটা কত বড় এবং প্রশস্ত। সুবিধাভোগীরা দেশটাকে এমনটাই ভাবে।

কবির কবিতায় যেমন একাত্তর, সে সময়ের গণহত্যা অধিকন্তর হয়েছে, এমনি অনেক কবিতা তৈরি হয়েছে সরাসরি শহীদদের নাম ধরে ধরে। কবি যেনো তাদের একান্তজন হয়ে কবিতার শিরোনাম করেছেন। যেমন, মুজিবের রক্তধারা, মকছুদ আলী’৭১, শহীদ মিলন, নুর হোসেন, শহীদ তাজুল, দাসু আলী, ইলামিত্র, কমরেড কছিরউদ্দীন, রাউফুন বসুনিয়া বসু, মনিসিংহ, আফান আলী—সহ অনেক শহীদদের নামে কবিতা লিখেছেন।

তিনি সবসময় মানবতার বৃহত্তর পরিসরকে বিবেচনায় রেখে কবিতা লিখেছেন। তাঁর কবিতায় যে বেদনা, তা শুধু বাঙালির নয়—তা সমগ্র মানবজাতির বেদনা। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কবিতাকে একটি সর্বজনীন মাত্রা প্রদান করেছে। এছাড়া, তাঁর কবিতায় একটি নৈতিক প্রত্যয় লক্ষ্য করা যায়—তিনি কেবল অতীতের গৌরবগাথা বর্ণনা করেন না, বরং সেই গৌরবকে বর্তমান জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চান। তাঁর কবিতায় একটি আহ্বান থাকে—মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান। এই আহ্বান তাঁকে একটি দায়িত্ববোধ সম্পন্ন কবিতাশিল্পীতে পরিণত করেছে।

পরিশেষে বলা যায়, গোলাম কিবরিয়া পিনুর কবিতায় জাতিবোধ ও মুক্তিযুদ্ধ কেবল সহজ দুটি বিষয় নয়; বরং এগুলো তাঁর কাব্যসত্তার মূল ভিত্তি। তাঁর কবিতা আমাদের শেকড়ের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, আমাদের ইতিহাসকে নতুন করে ভাবতে শেখায় এবং আমাদের ভবিষ্যতের পথ নির্দেশ করে। তাঁর কাব্যভুবনে জাতিসত্তা ও মুক্তিযুদ্ধ একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে, যা বাংলা সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এদিক থেকে গোলাম কিবরিয়া পিনুর কবিতা শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং তা একটি ঐতিহাসিক দলিল, একটি সাংস্কৃতিক স্মারক এবং একটি নৈতিক পথনির্দেশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে আমরা যেমন আমাদের অতীতকে বুঝতে পারি, তেমনি বর্তমানকে বিশ্লেষণ করতে এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শিখি। এজন্যই বলা যায়, গোলাম কিবরিয়া পিনুর কবিতায় জাতিবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের যে উপস্থাপনা, তা বাংলা কবিতার ধারায় এক অনন্য সংযোজন।


আরো পড়ুন...

অন্ধ আয়নার গল্প পড়ুন এখানে
মেডিকেল ও কাঁটাপাথর এখানে পড়ুন
গোলাম কিবরিয়া পিনু'কর্মকান্ড নিয়ে বিন্তর আলোচনা পড়ুন
৫টি কবিতা পড়ুন এখান
সোনালী কাবিন পাঠ আলোচনা এখানে
পাঁচটি কবিতা পড়ুন
ঝাউপাতার ঝাঁপতাল এখানে পড়ুন
ছবি আর্কাইভ ১ দেখুন
দেহখানি তার চিকন চাঁদ এখানে
নীলিতারা পড়ুন
দ্বীপ সরকার পরিচিতি পড়ুন
যোগাযোগ করুন এখানে








একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ