পৌষের ভাষা
আমার গ্রামের স্কুল ঘরে নোটিশ টাঙ্গানো——
“ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে
ছাদের কার্ণিশে শীতের ফিসফিসানি বেড়ে গেছে
তোমাদের জন্য ছুটি ঘোষণা”
স্কুলের পাশেই গেদাদের কুঁড়েঘর——
সেখানেও উস্কে দিচ্ছে শীতের মিছিল
আমার পুরাতুন বাড়িটা মাটির তৈরি
বাইরের দেয়ালে অসুস্থ শিশুর মতো ঝুলে আছে শীতের পা
রাত গভীর হলে, শীতের শরীর আরো খারাপ হয়
জ্বর জ্বর ভাব——নাক দিয়ে সর্দির স্রোত
শীতের কোন পিতামাতা নেই——
গায়ে লেপ জড়িয়ে দেবে কে?
একবার শুনেছিলাম, শীতকে বনবাসে রেখে
চলে গেছে ওর পিতা মাতা
সেই থেকে আমার গ্রামে, মাঘ পড়লে
শীতের ভয়ে আমরা বাহির হতে পারি না
শীতের রাজত্বে চলে যায় আমাদের ঘর দোর—রাস্তা ঘাট
আমরা মুলত মাইনকা চিপায় পড়ে গেছি
বাঁশঝাড়ে ওঁত পেতে আছে শীত
মাটির দেয়ালে ওঁত পেতে আছে শীত
চাদরের ভেতর ওঁত পেতে আছে শীত
এর থেকে কবে কখন নিস্তার পাবো হে ঈশ্বর!
দাদা
আমার বাড়ির উঠোনে একটা বয়স্ক আমগাছ——
আমার বৃদ্ধ দাদার মতো কাঁপছে সে’ও
মাঘের শীত যখন দরজায় এসে অনুমতিহীন
প্রেমিকার মতোন হির হির করে ঢুকে পড়ে
বৃদ্ধ দাদা আমার বৃক্ষের ভঙ্গিমায় দাড়িয়ে
থত্থর থত্থর করে কাঁপতেন
এখন দাদা নেই——আমগাছ আছে
শীতে আমগাছ কাঁপলে দাদার কথা মনে পড়ে——
আমগাছের কাঁপুনির ভেতর
কি সুন্দর হুমড়ি খাচ্ছিলো দাদার সাদা শুভ্র দাড়ি!
ভাবি,দাদা আমার এখনও বেঁচে আছেন
প্রার্থনার মতো সুর
যায়নামাজে দাড়িয়ে কত কথা হয়,ঈশ্বরের সাথে
এই নরক, এই নহর, বেহেস্ত, দোযোখ
তারপর ইনিয়েবিনিয়ে অন্য প্রসঙ্গ——
আস্তিক অথবা নাস্তিক, অথবা মধ্যবর্তী কোন প্রশ্ন
আমার বিশ্বাস আর নিঃশ্বাস আরো পোক্ত হয়
আরো মুখোমুখি হই——সমুখে আড়াল না রেখে
জানি,কোন পর্দায় আটকানো যায় না ঈশ্বরকে
সে অনেক কথা, তাবৎ বৃক্ষের পাতা কেন ঝরে যায়
কেন এই বৃষ্টি, এই রোদ
কেন হিন্দু, কেন মুসলিম অথবা আরো
আমি কাঁপছি না একটুও——
এতো উদ্ভ্রান্তভাবে আবেগ উড়িয়ে দিচ্ছে হাওয়া!
চোখের ছাপরি ঘরে এসে পড়ছে নোনতা প্রার্থনা
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কথা——
ফালতু অফালতু, হেসে,কান্নায়——অনেক প্রসঙ্গ
ভারত——পাকিস্থান, যুক্তরাষ্ট্র——ইরান, ইসরাইল——গাজা
অথচ,আমার সংসারের কথা বলা’ই হলো না ঈশ্বর!
ছবি ও নায়িকা
শুনলাম, তুমি আমার বাড়িতে এসেছিলে
ভুলেও তাকাওনি এদিক সেদিক
শুধু খোঁজ নিয়েছিলে——“আমি বেঁচে আছি কি—না”
বাড়িতে ঢুকতেই, মেইন গেটের সামনে
একটি ম্যুরাল নির্মাণ করেছি
বহুদিন বহুবছর, হাত বুলিয়ে বুলিয়ে
নরম কাদা মাটিতে——
পারতাম সিমেন্ট বালু দিয়ে, কিন্তু তা করিনি
মুখের ওপরে বাহাদুরি চুল এবং
নাকের পাশে বড় তিলটা এঁকেছি সুন্দর মতোন
অথচ, তুমি সেদিকে ভুলেও তাকাওনি
কার ম্যুরাল?
কে দীর্ঘ সময় করেছে খরচ——কার জন্য?
কে, কাকে চাষ করে চলেছে নিভৃতে?
অনেক প্রশ্ন রেখে এসেছিলাম হাওয়ার চিঠিতে
তুমি আর কোন প্রশ্নের দিকে হাঁটোনি
অথচ, বিস্তর পথ ছিলো হাঁটার
আমি কিভাবে বেঁচে আছি?
এই প্রশ্নটা যদি করতে——
ওখানে পুরুষ ম্যুরালটি দাঁড়িয়ে গিয়ে বলতো
“আমাকে ছুঁয়ে দেখো”
সেদিন আমকুড়ানীরা আমার উঠোনে এসে
তারাও প্রশ্ন করেছিলো——“ আমি কিভাবে বেঁচে আছি”
পুরুষ ম্যুরালটি, ওদের সকলের কোঁচায়
একটি করে দুঃখ ভরিয়ে দেয়, আর বলে
“বাড়ি গিয়ে খুলবে”
বাড়ি এসে, সে কী কান্ড!
সকলের কোঁচায় কোঁচায় চিংড়ি মাছের মতোন
আমার মুখ লাফাচ্ছে
ওদের মধ্যে যে তরুণী মাধবিলতার মতোন সুন্দর
ওর কোঁচায় শুধু একটি চিঠি ভেসে উঠেছিলো
তাতে লেখা——“আমি ভালো নেই”
সংশয়
যনজোটের ভেতর হেঁটে হেঁটে
যখন মুখ পট্টিতে নেমে আসবে জাপানি সূর্যরস্মি
আমি পুড়ে পুড়ে কালির মতোন হয়ে যাবো
চোখের নিচে, বয়ে যাবে অন্ধকারের সড়ক
যে সড়কটা হিরোশিমার দিকে চলে গেছে
তখন কি আমাকে আগের মতোই চিনবে?
ধরো, আমি কাকতালীয়ভাবে ঘুম থেকে জেগে দেখি
মাউন্ট এ্যাভারেস্ট হয়ে গেছি
আমার মুখ চোখে পাথরের জটিল রুপান্তর——
শরীরের প্রতিটি লোমকূপে ধীর ধীরে জন্ম হচ্ছে
তামা গলানোর যন্ত্র
আামকে ছুঁলেই তামা হয়ে যাবে সব
আমি মানুষের মতো নাই আর
পৃথিবীর মানুষেরা আমাকে সান কিং বলে চেনে
তখনো কি ওভাবেই চিনবে আমাকে ?
তোমার আমার নরম প্রেম কি তামা হবে না?
তুমি তো বলেছিলে একদিন,
আমি ডালে বসা বুলবুলি——আর তুমি গোলাপ?
আরো পড়ুন...

0 মন্তব্যসমূহ
ধন্যবাদ আপনাকে