দেহখানি তার চিকন চাঁদ” জিল্লুর রহমান শুভ্র’র শক্তিশালী কাব্য || দ্বীপ সরকার book review

দ্বীপ সরকার।। dweep sarkar।।  poet ।। কবি


“দেহখানি তার চিকন চাঁদ” জিল্লুর রহমান শুভ্র’র শক্তিশালী কাব্য

দ্বীপ সরকার


জিল্লুর রহমান শুভ্র একজন সমসাময়িক আধুনিক ধারার শক্তিমান কবি। কবির শৈশব কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে শুরু হয়েছিল। দরিদ্র পরিবেশে বেড়ে ওঠা, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবাকে হারানো জীবনের গভীর অভিজ্ঞতা তার লেখায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। কবিতায় তিনি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন। সমসাময়িক বাংলা কবিতার ভিড়ে যাঁরা নিজেদের স্বতন্ত্র কণ্ঠ, ভাবভঙ্গি ও দার্শনিক দৃষ্টি দিয়ে আলাদা হয়ে উঠেছেন—কবি জিল্লুর রহমান শুভ্র তাঁদের অন্যতম।

আজকে তার একটি কবিতার বই নিয়ে কথা বলবো। “দেহখানি তার চিকন চাঁদ”। এটি কবির চতুর্থ কবিতার বই। প্রকাশ করেছে ‘পুন্ড্র প্রকাশন” অমর একুশে বইমেলা/২৫। দারুণ আকর্ষনীয় প্রচ্ছদ এঁকেছেন অরণ্য প্রভা। উৎসর্গ করেছেন সমসময়ের তিনজন কবিকে—যথাক্রমে মাসুদ খান,জুয়েল মাজহার,তুষার কবির। বইটিতে ৪৪টি কবিতা মুদ্রিত হয়েছে। মুল্য রাখা হয়েছে ২৩০ টাকা মাত্র। এটি একটি অসামান্য উপহার। প্রতিটি কবিতার যে গভীরতা—তা কবির নিজস¦ চিন্তা ও প্রজ্ঞাকে অনেক উচ্চে নিয়ে যায়। কবি কখনো একক চিন্তায় স্থির থাকেননি—কবিতার ভেতর দিয়ে হেঁটে গিয়েছেন বহুদূর। এত চিত্রকল্প,উপমা,বিশেষ করে নতুন নতুন শব্দ তৈরিতে অনন্য কণ্ঠস্বর স্থাপন করেছেন। পাঠক বইটি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করলেই বুঝতে পারবেন। অধিকাংশ কবিতা গদ্য ঢঙের,মাঝারি এবং দীর্ঘ অবয়বের। বই থেকে কিছু উদ্ধৃতি পাঠকের জন্য তুলে ধরছি।

“তোমার দু’গালে দেখেছিলাম দুটি চাঁদ; খেলা করে অদ্ভূত মায়ার ফণা তুলে
নীল বিষের সমুদ্র—অভিযান শেষে, হায় মধুরা, হাত দিই তোমার চুলে।
চুল তো নয় যেন ঈশানের বিস্রুত মেঘ, কুটাভাসে কথা বলে
হারাই কোথাকার এক মগধে! আবার ফিরে আসি মগজে.খেলার ছলে
পূর্বাষাড়া যখন ভিড় করে আকাশের সুদূরতম বন্দরে। নতজানু হয়ে
অপৌরষের সুখের পালক ছড়াই তোমার কটিদেশে; তক্ষকের চোখ ক্ষয়ে

ক্ষয়ে তখন অন্ধ কুনোমাতাল ডুমুর
পরান্ত সহিসের রাত অবিরাম ড্যাশচিহ্ন আঁকে যদি বাজে বেদনার ঘুঙুর!
উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, জিঘাংসার ত্রিসঙ্গম ছেড়ে ঐকতানের চারটি পাখি
কালের ডানায় উড়ছিল, উড়ছে, উড়বে আরও; তাদেরকেও দেয়নি ফাঁকি,
যাদের দেহ স্থবির হয়ে আছে কুয়ারশার গভীর ঘুমে। রাতচিল জেগে থাকে,
ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের আর্কিমিডিস নীলাভ সমুদ্রে নুনের বিষাদ মাপে, মোহনার বাঁকে
জলের কোলাহলে গভীর গোপন একজন ফেলে গেছে তার মনোভূমি;
আর যেন দম নিয়ে বলতে না হয়,—মথুরা, কেমন আছ তুমি”?
(কবিতা, মথুরা)
আধুনিক বাংলা কবিতায় এমন কিছু রচনা আছে, যেখানে সরল বর্ণনার চেয়ে অনুভূতি, চিত্রকল্প ও চেতনাপ্রবাহই মুখ্য হয়ে ওঠে। মথুরা কবিতাটি সেই ধারারই এক শক্তিশালী উদাহরণ। কবিতার শুরুতেই কবি প্রেয়সীর রূপ বর্ণনা করেন—“তোমার দু’গালে দেখেছিলাম দুটি চাঁদ”—এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে সুন্দর্যের ইমেজারি নির্মিত হয়েছে। চাঁদ সাধারণত সুন্দর্য ও মাধুর্যের প্রতীক। কবি তারপর “নীল বিষের সমুদ্র” পেরিয়ে যেতেও প্রস্তুত তবু তার প্রিয়সীর চুলের স্পর্শ পেতে চান। অর্থাৎ কবির কাছে প্রেম মধুর হলেও তা কখনো শঙ্কামুক্ত নয়। প্রেয়সীর চুলের বর্ণনায় কবি পৌরাণিক মিথ ব্যবহার করেছেন—“ঈশানের বিস্রুত মেঘ” এই উচ্চারণে। এখানে চুল হয়ে উঠেছে অস্থিরতা ও প্রলয়ের প্রতীক। সেই চুলের ভেতর কবি নিজেকে হারিয়ে ফেলেন “এক মগধে”। মগধ এখানে ভারতের একটি প্রাচীন ভূ-খন্ডের নাম যা ইতিহাস, অতীত ও সভ্যতার ইঙ্গিত দেয়। এই হারিয়ে যাওয়া আসলে নিজের চেতনার ভেতরে ডুবে যাওয়ারই বাস্তবরূপ। কবিতার মধ্যভাগে শরীরী প্রেমের দৃশ্য অত্যন্ত তীব্র ও স্পষ্ট। “নতজানু হয়ে” প্রেয়সীর কটিদেশে সুখের পালক ছড়ানোর বর্ণনা একদিকে গভীর কামনার প্রকাশ, অন্যদিকে তা “অপৌরষের” অর্থাৎ মানুষের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া এক অনুভূতির দিকে। কিন্তু এই সুখও নিরাপদ নয়।

মথুরা কবিতার ভাষা ও গঠন লক্ষ করলে দেখা যায়, এটি দীর্ঘ বাক্য হলেও তা দ্রুত প্রবাহমান ভাবনার মাধ্যমে গঠিত। এই শৈলী পাঠককে অনুভবের জগতে নিক্ষেপ করে। সময় এখানে সরলরেখায় প্রবাহিত নয়—“উড়ছিল, উড়ছে, উড়বে”—অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে যায়। জীবনের গতির পাশে থাকে মৃত্যুর স্থবিরতা—“যাদের দেহ স্থবির হয়ে আছে কুয়াশার গভীর ঘুমে” পঙ্ক্তিতে তা স্পষ্ট। শেষাংশে কবিতাটি আরও গভীর দার্শনিক স্তরে পৌঁছায়। “রাতচিল”, “ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ”, “নীলাভ সমুদ্র”—সব মিলিয়ে এক নিঃসঙ্গ, ক্ষয়মান জগতের ছবি আঁকা হয়েছে এখানে। এই জগতে কেউ একজন “মনোভূমি” যেন প্রেমিক নিজেই নিজের অনুভূতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কবিতার শেষ পঙ্ক্তি—“মথুরা, কেমন আছ তুমি?”একটি সাধারণ প্রশ্ন হলেও তা দর্শনগত দিক থেকে বিস্তৃত অর্থ বহন করে। ফলে কবিতাটি পাঠকের কাছে এক সহজ অনুভূতির গল্প না হয়ে বরং তা হয়ে উঠেছে গভীর উপলব্ধির শক্তিশালী অভিজ্ঞতার বিন্যাস।

“একটু একটু মনে পড়ে
তোমার হলুদ ওড়নার এক প্রান্ত তখনও উড়ছিল বাতাসে;
ছিল শতেকখোয়ারি মায়ার প্রলোভন তাতে।

নারী পটানোর ম্যাকিয়াভেলি কৌশল জানতাম না আমি,
খুব আলাভোলা সাদাসিধে গোবেচারি একজন,
মনটা ছিল নরম কাদামাটি;
ফুলের সুষমা দিতে এসে গড়েছে কেউ কীটপতঙ্গের বেলাভূমি”।
(কবিতা, দেহখানি তার চিকন চাঁদ)
খুব নরম আর কষ্টমাখা একটা চিত্রকল্প এটা। এখানে স্মৃতিটা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে যেন বাতাসে ওড়না নড়ার সঙ্গে সঙ্গে অতীতও নড়ে উঠছে। হলুদ ওড়নার উড়ালটা শুধু দৃশ্য নয়, সেটা আকর্ষণ আর মায়ার গভীর টান। আর “শতেকখোয়ারি মায়ার প্রলোভন” লাইনে সেই টানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। দ্বিতীয় স্তবকে যেটা সবচেয়ে আঘাত করে, সেটা আত্মস্বীকারোক্তির ভঙ্গি। কবি নারী পটানোর জন্য ম্যাকিয়াভেলির মতো কৌশল জানেন না বরং গ্রাম্য আলাভোলা, গোবেচারি এক প্রেমিক। এই সরল স¦ীকারোক্তি কবিকে করে তুলেছে সততার প্রতীক। আবার “কীটপতঙ্গের বেলাভূমি” ইমেজটা আরেক দর্শনের উপস্থিত করেছে। “ফুলের সুষমা দিতে এসে গড়েছে কেউ কীটপতঙ্গের বেলাভূমি”। ফুলের ঘ্রাণ দিতে এসে কেউ কীটপতঙ্গের বেলাভুমি হয়। এখানে প্রেমটা ভুল বোঝাবুঝির ইঙ্গিত দেয়। “কেউ” শব্দ ব্যবহারে এখানে অবিশ্বাস এবং প্রতারণার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে কবি এখানে ব্যথা প্রাপ্ত হয়েছেন অথচ কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু স্মৃতি আর নিজের নরম কাদামাটির মতো মন।
“তখন ক্লাস এইটে
বয়ঃসন্ধিকালের কপাট খুলে চিকন সরু মোচ,
সবে প্রদর্শন শুরু; অন্ডকোষ তখনও চাঁদ ও
সূর্যের পার্থক্য বোঝেনি”।
(কবিতা, দেহখানি তার চিকন চাঁদ)
এই অংশটা আগের স্তবকের সঙ্গে দারুণভাবে বয়সের বাস্তবতাজুড়ে আছে। স্মৃতির রোমান্টিক আবহে কবির কাঁচা শরীর কেমন সত্য হয়ে উঠেছে। “তখন ক্লাস এইট” একটা নির্দিষ্ট সময় ফ্রেম তৈরি হয়েছে। বয়ঃসন্ধিকালের কপাট খুলে—এই বাক্যটা খুব চিত্রময়। চিকন সরু মোচের “সবে প্রদর্শন শুরু” লাইনে আছে কৌতুক আর লাজুকতার আভাস। সবচেয়ে সাহসী ও আলাদা হয়ে গেছে শেষ লাইনটা “অণ্ডকোষ তখনও চাঁদ সূর্যের পার্থক্য বোঝেনি” । উপমাটা কবিতার ভেতরে দর্শন হিসেবে কাজ করেছে, কারণ এটা আসলে যৌনতা নয়, অপরিণত বয়সের বোঝাপড়ার আভাস। “দেহখানী তার চিকন চাঁদ” কবিতার শরীর দীর্ঘ হলেও এর ভেতরে কোন স্থুলতা নেই,আছে গভীর চিন্তার পরিসর।

“বোধিবৃক্ষের নিচে আদমের কঙ্কাল হাতে
যখন নিঃশ্বাস নেই
সমুদ্র তখন বিক্ষুদ্ধ চিত্তে তার জাতকিনীর ডায়েরি পড়ে”:
(কবিতা, বোধিবৃক্ষ)

কবিতা বোধিবৃক্ষ থেকে এই স্তবকে পুরাণ, দর্শন আর শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। “বোধিবৃক্ষের নিচে আদমের কঙ্কাল হাতে” এখানে বোদিবৃক্ষ হলো সেই পবিত্র অশ্বন্থ বৃক্ষ যার নিচে সিদ্ধার্থ গৌতম “বোধি” বা জ্ঞান লাভ করেছিলেন। সেখানে হযরত আদম (আঃ) এর কঙ্কাল হাতে নিঃশ্বাস নিয়ে আস্বস্ত হতে চান কবি। বুদ্ধের জ্ঞানলাভ আর পাপের নিষ্কলুষতা—এক ফ্রেমে আবদ্ধ করা হয়েছে। কঙ্কাল এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ— এটা শরীরের নয়, বরং অতীতের একটা বৃহৎ জাতির অবশিষ্টাংশ। “সমুদ্র তখন বিক্ষুদ্ধ চিত্তে তার জাতকিনীর ডায়েরি পড়ে”এখানে সমুদ্র এক বিশাল চেতনাসত্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আর “জাতকিনীর ডায়েরি পড়ে” চিত্রকল্পে কবি এখানে সমুদ্র তার প্রেয়সীর প্রেমের ডায়েরি পড়ছেন—যা নিজের আত্মজীবনী পড়ার দৃশ্যকল্পের মতো। অথবা সেই নারীর গল্প, যা প্রথম আকর্ষণ, প্রথম মায়ার প্রতিমূর্তি—আর সমুদ্র সেই মায়ার প্রতীক।

“আহা সমুদ্র, তোমার কপালে এক ফোঁটা মুক্তিকার টিপ!
হাওয়া এসে উড়িয়ে নিতে চায়, ওড়ে না; আর
আমরা উড়তে আসি, উড়তে উড়তে নক্ষত্রপুঞ্জে; দস্তানা খুলে
তারা অপেক্ষা করে আমাদের উচ্ছ্বাসের হৃৎপিণ্ড ছুঁতে।
আমরা জানি সমুদ্র ঘুমায় না
তার ঘুমহীন চোখে ঘুমিয়ে থাকে আগুনমুখো দানবরা
ঘুম ভাঙলেই বেসামাল; ধৈর্যহীন তারা”।
(কবিাত, নারকেল জিঞ্জিরা)

“এক ফোঁটা মুক্তিকার টিপ” এই ইমেজটা পুরো কবিতার ভেতরের ঘ্রান ছুঁড়ে দেয়। সমুদ্রের প্রতিটা ঢেউয়ে বালুকণা,সাদা মৃত্তিকা ভেসে যায় যা সমুদ্রের কপালে টিপ বলে চিত্রায়িত করা হয়েছে। হাওয়ার সঙ্গে এই মৃত্তিকাগুলো উড়ে যায় না অথচ উড়িয়ে নিতে চায়। তারপর বলেন, আমরা মানুষ উড়ে যাই নক্ষত্রপুঞ্জে— মানে প্রতিনিয়ত পর্যটকরা উড়ে আসে। এই উড়ে আসা খুব সিনেম্যাটিক এবং আবেগিক। দস্তানা খুলে সমুদ্র পর্যটকদের অপেক্ষায় থাকে —অসাধারণ আবেদনময়ী একটা চিত্রকল্প। শেষ দিকে এসে কবিতাটা আরো গাঢ় হয়ে ওঠে। আমরা জানি সমুদ্র ঘুমায় না—এই উচ্চারণ বিস্তৃত চিন্তার গভীরে পাঠককে নিপতিত করে। ঘুমহীন চোখে ঘুমিয়ে থাকে আগুনমুখো দানবরা। মানে,বর্তমান সমুদ্র শাসন ব্যবস্থ্ার প্রতি কবির হুংকার। চরম সত্যকে কবি খোলাসা করতে চয়েছেন “দানব” শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে। এখানে দখলদারিত্ব, মাফিয়াবাজরা প্রতিনিয়ত দানবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়—তার প্রতিই কবির ভয়ংকর উচ্চারণ।

“ক, আমি তো ছিলাম আমার ভেতর ঘুমের মতো;
     তোমার প্রেম আমাকে জাগিয়ে দিয়ে পাগল করল।
খ, ঈশ্বরকে ছোঁয়া যায় না, তবে ভালোবাসাকে যায়;
    আর ঈশ্বর ভালোবাসার সংসারে থাকতে পছন্দ করেন।
গ, জীবনের পরিপূর্ণতা যেন দূরের চাঁদ;
   হাতছানি দেয় কাছে আসে না”।
   (কবিতা, বারোয়ারি)

কবিতা বারোয়ারি— কয়েকটি অণুকবিতার সমষ্টি। তার মধ্যে তিনটির তাৎপর্য তুলে ধরা হলো। (ক) কবি এখানে প্রেমকে “জাগরণ” হিসেবে উপস্থিত করেছেন। কবি নিজের ভেতর দীর্ঘঘুমে আত্মমগ্ন অবস্থা থেকে হঠাৎ উন্মত্ত সচেতনতায় ফিরে আসেন। আর এই অবচেতন থেকে চেতনায় ফিরে আসার পিছনে “পাগল করল” শব্দটি প্রেমের আশীর্বাদরুপে এসেছে। (খ) “ঈশ্বরকে ছোঁয়া যায় না, তবে ভালোবাসাকে যায়;” এটা সবচেয়ে দার্শনিক একটা উচ্চারণ। ভাষ্যে সহজ হলেও গভীর চিন্তার পেরেক মেরেছেন কবি। ঈশ্বর ও ভালোবাসার সম্পর্ককে বিপরীতভাবে দেখালেও এর মুল দর্শন হলো— যিনি ভালোবাসাকে ছুঁতে পারেন তিনি ইশ্বরকেও ছুঁতে পারেন। অর্থাৎ ভালোবাসা দিয়ে ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ করা যায়—এটাই মুলত ঈশ্বরের সংসার। (গ) এখানে চিরাচরিত অতৃপ্তি আর হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। “জীবনের পরিপূর্ণতা যেন দূরের চাঁদ;/হাতছানি দেয় কাছে আসে না”। পরিপূর্ণতা যেন চাঁদ, ডাক দেয় কিন্তু ধরা দেয় না। জীবনের প্রাপ্তি সব সময় অধরাই থেকে যায়। এটা একটা চমৎকার উপমা—চাঁদ আর জীবনের অপ্রাপ্তি।

“কুয়াশার মেঘের ভেতর হেঁটে যেতে যেতে দেখি
গাঁজাখোরের চোখের মতন একজোড়া চোখ,
হস্তিনাপুরের টেরাকোটায় বন্দি ক্রীতদাসীর দীর্ঘশ্বাসের
মতো গুমরে গুমরে কাঁদছিল সে”।
(কবিতা, প্রেম যখন সর্বনাশের কুঠার)

কবিতা সূচনা হয় “কুয়াশার মেঘের ভেতর হেঁটে যেতে যেতে”—এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে। কুয়াশা এখানে কেবল প্রকৃতির উপাদান নয় এটি অনিশ্চয়তা, অস্পষ্ট গন্তব্যের প্রতীক। এই অস্পষ্টতার ভেতর হঠাৎ আবির্ভূত হয় “গাঁজাখোরের চোখের মতো একজোড়া চোখ”। উপমাটি অনান্দনিক হলেও এখানে রোমান্টিক সুন্দযের্র প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এখানে একজোড়া চোখ মানে কোন এক প্রেমিকার প্রতি কবির ইঙ্গিত—যিনি ক্রীতদাসীর দীর্ঘশ্বাসের মতো গুমরে গুমরে কাঁদছিল। কবি পরের চরনে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করেন—“হস্তিনাপুরের টেরাকোটায় বন্দি ক্রীতদাসীর দীর্ঘশ্বাসের মতো”। হস্তিনাপুর এখানে মহাভারতের একটি নগরী হলেও এটি ক্ষমতা, রাজনীতি ও পিতৃতান্ত্রিক শাসনের প্রতীক হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। এখানে ক্রীতদাসের বন্দিদের দীর্ঘশ্বাস কবিকে ব্যথিত করেছে—যার তুলনা করা হয়েছে কোন প্রিয়তমার সাথে “সে” শব্দের ভেতর দিয়ে। তাঁর দীর্ঘশ্বাসের মাধ্যমে কবি নীরব যন্ত্রণাকে ভাষা দেন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে আছে। ব্যক্তির কান্না এখানে ইতিহাসের কান্নায় রূপ নিয়েছে। এরপর একটি গদ্য কবিতার দিকে নজর দেয়া যাক।

“বেঁচে থাকার অর্থ নেই, তবু বেঁচে থাকতে হয়। বেঁচে থাকার অর্থ আছে, তবু চলে যেতে হয়। ঘামের শেকল পরা এই জীবন যখন বেহালার করুণ সুরে বাজে, বিমূঢ় স্বপ্নের পলেস্তারা যখন ঝুরঝুর করে খসে পড়ে, চাওয়া-পাওয়ার মেঘদল ইচ্ছের পৌরহিত্য না করে যখন ঘুমিয়ে পড়ে নদীর বিছানায়, তখন জীবনের মানেগুলো কেবলই অন্ধকার হাতড়াই। যে অন্ধকার চলে গেছে অন্ধকারের সওয়ার হয়ে, সেখানে হরিণীদের অন্ধ চোখে সূর্যাস্ত নামে”।
(কবিতা,বিধির গ্যাঁড়াকল)

এটি একটি গদ্য প্যাটার্নের কবিতা। মুক্তক ছন্দের ব্যঞ্জনা আছে,আছে গভীর চিন্তার ও দর্শনের সুর। বেঁচে থাকার চিৎকার যেনো ব্যাক্তি থেকে বৈশ্বিক হয়ে উঠেছে। বেঁচে থাকার অর্থ নেই, তবু বেঁচে থাকতে হয়। এখানে পুরো যাপমান জীবনের ইমেজ দাঁড়িয়ে আছে। না পুরো হতাশা, না পুরো মুক্তি। ঘামের শেকল দারুণভাবে উপমিত হয়েছে। ঘামকে শেকলের সাথে, জীবনকে বেহালার সাথে। স্বপ্নের পলেস্তারা খসে পড়ছে মানে কবির নিদারুণ হতাশা—কবির স্বপ্ন যেনো নদীর বিছানায় শুয়ে আছে,কোন ক্রমেই তা ধরা দেয় না। চাওয়া—পাওয়া ও ইচ্ছেগুলো অধরাই থেকে যায়। শেষের দৃশ্য খুব শক্তিশালী—“যে অন্ধকার চলে গেছে অন্ধকারের সওয়ার হয়ে, যেখানে আলোর হরিণীদের অন্ধ চোখে সূর্যাস্ত নামে”। অন্ধকার নিজেই অন্ধকারের সওয়ারে চড়ে চলে গেছে, আর “আলো”হরিণীর মতো চোখ বুজে সূর্যাস্ত মেনে নিয়েছে। এটা গভীর দঃখ ও হতাশার বিস্তৃতি ছড়িয়েছে সবখানে।

সব শেষে কবি জিল্লুর রহমান শুভ্র’র “দেহখানি তার চিকন চাঁদ” কাব্যগ্রন্থ পাঠক মহলে সমাদৃত হবে সেটা নিশ্চিন্তে বলতে পারি। তার কবিতা সহজে ধরা দেয় না—উপমা, রূপক, প্রতীক,নতুন নতুন এবং অভিনব শব্দ চয়ন, অন্তর্নিহীত ভাষার ঘনঘটা পাঠকের মনে দারুনভাবে নাড়া দেবে বলে আশা করি।

****
সমাপ্ত


আরো পড়ুন...
অন্ধ আয়নার গল্প পড়ুন এখানে
মেডিকেল ও কাঁটাপাথর এখানে পড়ুন
গোলাম কিবরিয়া পিনু'কর্মকান্ড নিয়ে বিন্তর আলোচনা পড়ুন
৫টি কবিতা পড়ুন এখান
সোনালী কাবিন পাঠ আলোচনা এখানে
পাঁচটি কবিতা পড়ুন
ঝাউপাতার ঝাঁপতাল এখানে পড়ুন
ছবি আর্কাইভ ১ দেখুন
দেহখানি তার চিকন চাঁদ এখানে
নীলিতারা পড়ুন
দ্বীপ সরকার পরিচিতি পড়ুন
যোগাযোগ করুন এখানে


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ