অস্তিত্ববাদী গল্প। ভাঙা ঘড়ির সময়। story by dweep sarkar। দ্বীপ সরকার

 অস্তিত্ববাদী গল্প

অস্তিত্ববাদী গল্প।। দ্বীপ সরকার



   ভাঙা ঘড়ির সময়
দ্বীপ সরকার

বৃদ্ধ মানুষটির নাম হরিদাস পাল। বগুড়া শহরের রেললাইনের ধারে ছোট্ট একটা দোকান—“পাল ঘড়িঘর”। বহুদিনের আধ খসে পড়া দেয়ালের ছাপড়িঘর। ইট বালু দাঁত বের করে কোথাও হা করে আছে। দোকানের ভেতর ঢুকলেই টিকটিক শব্দের মৃদু এক সঙ্গীত শোনা যায়। দেয়ালে ঝুলছে নানা রকম ঘড়ি— হাত ঘড়ি,দেয়াল ঘড়ি.টেবিল ঘড়ি,জিটিটাল ঘড়ি। তবে অধিকাংশ ঘড়ি ভাংগাচোরা। কোনোটা কাস্টমারের— মেরামত করে দেয়ালে ঝুলিয়ে দিয়েছে। কেনোটা কাস্টমারের কাছ থেকে যৎসামান্য অর্থে ক্রয় করে সেটি আবার মেরামত করে বিক্রীর জন্য দেয়ালে ঝুলিয়েছে। সব পেন্ডুলামের ভেতর যেন একটাই সুর—সময় বয়ে যাচ্ছে। সময় নদীর স্রোতের মতো অচেনা অজানা গন্তব্যের দিকে ধেয়ে ছুটছে। কিন্তু হরিদাসের কাছে সময় আর বয়ে যায় না। তার কাছে সময় থেমে আছে বারো বছর আগে— যেদিন তার স্ত্রী সরলা মারা গেলেন। সরলার মৃত্যুর দিনে দেয়ালের বড় দেয়াল ঘড়িটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হরিদাস পরে বহুবার সেটি ঠিক করতে চেয়েছেন,পারেননি। যেনো ঘড়িটি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে—সে থেমে থাকবে।

সরলা অসুস্থ ছিলেন অনেকদিন। চিকিৎসা করাতে করাতে হরিদাস দোকান ফাঁকা করেছিলেন। এই ছোটো ব্যবসাও লাটে উঠেছিলো। একদিন সরলা বলেছিলেন—“দোকানের অচল ঘড়িগুলোর সময় ঠিক করো,তার সাথে নিজের সময়টাও ঠিক করো”। হরিদাস হাসতে পারেননি। মনে হয়েছিলো বড় করে হাসলে কিছুটা হালকা হবে—কিন্তু মনের গভীরে হাসিকে লুকিয়ে রাখে। কারণ,তার মনে হয়েছিল, সময় ঠিক করা যায় না— শুধু মাপা যায়।

সরলার মৃত্যুর পর তিনি আরও বেশি করে কাজে ডুবে গেলেন। প্রতিটি ভাঙা ঘড়ি যেন তার কাছে একেকটি স্বীকারোক্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, যদি সব ঘড়ি ঠিক থাকে, তবে পৃথিবীও ঠিক থাকবে। সময় সময়ের স্রোতে ছুটবে। কিন্তু তিনি যে রাত নামলেই, দোকানের টিকটিক শব্দের মাঝখানে শুনতে পান এক নিঃশব্দতা—যেখানে সরলার কণ্ঠ নেই।

একদিন বিকেলে বৃষ্টি পড়ছিল—চিরদিকে অন্ধকার। দোকানের সামনে কাদাজল জমেছে। তখনই এক বালক এলো। বয়স দশ—এগারোর বেশি নয়। ভেজা চুল, চোখে অদ্ভুত স্থিরতা। হাতে একটা পুরোনো হাতঘড়ি।
—কাকু, এটা ঠিক করবেন?
হরিদাস ঘড়িটা হাতে নিলেন। সস্তা ঘড়ি, কাঁচে ফাটল। কাঁটা আটকে আছে তিনটা বেজে সাত মিনিটে।
—কখন থেকে বন্ধ?
বালক একটু থেমে বললো,
—যেদিন মা চলে গেছে,সেদিন থেকে।
হরিদাস থমকে গেলেন। চোখ মুখে স্থিরতা মেখে বললেন,
—চলে গেছে মানে?
—মা ট্রেনে চাপা পড়েছিল। সেইদিন বিকেলে, ঘড়িটা তখন তিনটা বেজে সাত মিনিট ছিল।
বৃষ্টির শব্দ যেন আরও ঘন হয়ে উঠল। চারদিকে আরও ছেয়ে আসলো অন্ধকার। হরিদাস ঘড়ির পেছন পার্টটা খুললেন। স্প্রিং আটকে গেছে। তিনি জানেন, এটা ঠিক করা সম্ভব। কিন্তু বালকটি হঠাৎ বললো,
—কাকু,এটা ঠিক করলে কি সময়টা আবার চলবে?
—অবশ্যই
—তাহলে আমি চাই না
হরিদাস অবাক হলেন।
—কেন?
—মা ওই সময়েই বেঁচে ছিল। যদি ঘড়ি চলে, তবে মা ওই সময় থেকে সরে যাবে।

বালকটির এই কথার পর দোকানের সব টিকটিক শব্দ যেনো থেমে গেলো। হরিদাস বুঝলেন, ছেলেটি সময়কে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। যেনো তিনটা বেজে সাত মিনিটই তার আশ্রয়। এ সময়টিই তার জীবন চলার কেন্দ্র।
হরিদাস ধীরে বললেন,
—সময় থামিয়ে রাখলে কি মানুষ বাঁচে?
বালকটি চুপ করে রইল। তার চোখে জল নেই, কিন্তু অদ্ভুত এক শূন্যতা আছে। নিঃশ্বাসের বড় বড় শব্দ শোনা যায়।

সেই রাতে হরিদাস ঘুমোতে পারলেন না। তার মনে পড়ল সরলার শেষ বিকেল। তখনও বড় দেয়াল ঘড়িটির পেন্ডুলাম চলছিল। সরলা নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছিলেন। এ্যাজমা এতোটাই বেড়েছিলো যে সরলা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে সটান হয়ে পড়ে। সরলা আস্তে ছোটো করে একবার বলেছিলেন,
—সময় থামিও না, হরি
হরিদাস তৎক্ষনাত বুঝতে পারেননি,এ কথাটার মানে কী। সরলা কি বুঝাতে চেয়েছিলেন। তারপর ছটফট করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তখন বিকেল তিনটা।

এর তিনদিন পর সন্ধ্যায় বালকটি আবার এলো।
—কাকু, ঠিক করবেন?
হরিদাস কষ্ট মেখে জিজ্ঞেস করলেন,
—তুমি কি সময় থামিয়ে রাখতে চাও?
—হ্যাঁ
—কিন্তু তুমি তো বড় হবে। স্কুলে যাবে, বন্ধু হবে তোমার, চাকরি করবে। তখনও কি তিনটা বেজে সাত থাকবে?
বালক এবারও মাথা নিচু করলো।
—আমি ভয় পাই। সময় এগোলে মা’র মুখ ভুলে যাই যদি।
হরিদাসের বুক কেঁপে উঠলো। তিনিও ভয় পান—সময় এগোলে সরলার মুখ ফিকে হয়ে যাবে। একদিন হয়তো ভুলেই যাবে। তাই তিনি বড় দেয়াল ঘড়িটি আজও ঠিক করেননি। যেন সরলার মৃত্যুর মুহূর্তটিকে আটকে রেখেছেন।

হরিদাস ঘড়িটা টেবিলে রেখে বললেন,
—শোনো বাবা, সময় থামানো যায় না। আমরা শুধু কাঁটা আটকে রাখি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সময় চলতেই থাকে। তুমি যদি কাঁটা না ঘোরাও,ঘড়ি মেরামত না করো, তবু তুমি বড় হবে। তখন কি করবে?
বালক চুপ থাকে। হরিদাস আবার বলে,
—তোমার মাকে মনে রাখতে হলে সময়কে চলতে দাও। সময়ের ভেতরেই স্মৃতি বেঁচে থাকে।

বালকটি বিস্ময়ে তাকালো হরিদাসের দিকে।
—আপনি কি কাউকে হারিয়েছেন?
হরিদাস মৃদু হাসলেন।
—হ্যাঁ। আমিও সময় থামাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বুঝেছি, সময় থামালে শুধু নিজেকে অন্ধকারে রাখা হয়।
এরপর হরিদাস কিছুক্ষণ নীরব। তারপর বালক বললো,
—তাহলে ঠিক করুন

হরিদাস ধীরে ধীরে ঘড়ির স্প্রিং বদলালেন। কাঁটা ঠিক করলেন। তিনটা বেজে সাত মনিটি থেকে পেন্ডুলাম চালিয়ে দিলেন। ঘড়িটি টিকটিক করে উঠল। শব্দ অতি ছোটো ছোটো, কিন্তু যেন বিশাল এক ঘোষণা—সময় আবার চলছে।
বালক ঘড়ি হাতে নিলো। আস্তে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো,
—কাকু, যদি আমি মাকে ভুলে যাই?
—ভুলে যাওয়া মানে হারানো নয়। মনে রাখার জন্য সময় চলমান রাখা দরকার।

বালক চলে গেলে হরিদাস তার দোকানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দেয়ালের বড় ঘড়িটি বারো বছর ধরে বন্ধ। তিনি চেয়ার টেনে এনে সেটি নামালেন। ভেতরের যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করলেন। হাত থর থর করে কাঁপছে। মনে হচ্ছিলো, তিনি সরলাকে আবার হারাবেন। ঘড়ি খুলতে খুলতে তার মনে পড়লো সরলার কথা—“সময় থামিও না হরি”। হরিদাস বুঝলেন, সরলা চেয়েছিলেন তার স্বামী বাঁচুক সময়ের সঙ্গে। ঘড়ির ভেতরে মরিচা পড়েছে। স্প্রিং বদলাতে হবে। তিনি নতুন স্প্রিং লাগালেন। কাঁটা সেট করলেন। তারপর ধীরে পেন্ডুলাম দোলালেন।
টিক... টিক... টিক...

দোকান আবার ভরে গেলো শব্দে শব্দে। হরিদাসের চোখে জল এলো। মনে হলো, সরলা যেন পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু এবার তিনি বুঝলেন—সরলা নেই, তবু সময় আছে। আর সময়ের ভেতরেই তার স্মৃতি। সন্ধ্যায় বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশে ফিকে আলো। হরিদাস দোকানের দরজা বন্ধ করতে করতে দেখলেন, রাস্তার ওপারে সেই বালক দাঁড়িয়ে। হাতে ঘড়ি, মুখে একটুখানি হাসি। হরিদাস হাত নেড়ে ইশারা করলেন। বালকও হাত নাড়ালো। হঠাৎ হরিদাস অনুভব করলেন—সময় আসলে শত্রু নয়। সময়ই মানুষকে এগিয়ে দেয়, শূন্যতার ভেতর থেকে অর্থ খুঁজে নিতে শেখায়। রাত নামলো। দোকানের ভেতরে সব ঘড়ি টিকটিক করছে। প্রতিটি শব্দ যেন বলছে—অস্তিত্ব মানে চলা। মৃত্যু মানে থেমে থাকা নয়, একটু স্থবিরতা,একটু জীবনের ছন্দপতন। হরিদাস চেয়ারে বসে ভাবলেন, মানুষ আসলে সময় মেরামত করে না—বরং নিজের ভাঙা সত্ত্বাটি মেরামত করে। প্রতিটি কাঁটার চলা মানে—সরলা বেঁচে আছে, তাই সময়ও আছে।

হরিদাসের মনে হলো, সরলার মৃত্যু তাকে শূন্য করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই শূন্যতার ভেতরেই তিনি নিজের সত্তাকে নতুনভাবে চিনেছেন। সময়কে আটকাতে গিয়ে তিনি বুঝেছেন—অস্তিত্ব মানে গ্রহণ করা, অস্বীকার নয়। দোকানের শেষ আলো নিভিয়ে তিনি বাইরে এলেন। রেললাইনের ওপারে দূরে একটি ট্রেনের হুইসেল শোনা গেলো। ট্রেন এগিয়ে যাচ্ছে, থামছে না। হরিদাস মনে মনে বললেন—যাও, সময় যাও। আমি আর তোমাকে আটকাব না। দোকানের ভেতরে এতোদিনের পড়ে থাকা দেয়াল ঘড়িটিও দুলছে।
টিক... টিক... টিক...সময় চলছে।



আরো পড়ুন....

মিনিখ ও মেরাজের নৈঃশব্দ পড়ুন এখানে
কবিতা অরফিয়াস পড়ুন এখানে
বাংলা একাডেমি পড়ুন এখানে
মাটির হেঁসেল পড়ুন এখানে
উপসচিব ও অন্যান্য কবিতা পড়ুন
ছবি ব্লগ কিস্তি ২ এখানে
জুবিলিদের পাশের বাড়ির মেয়েটি পড়ুন এখানে
কবিতা উপসচিব ও অন্যান্য পড়ুন এখানে
অন্ধ আয়নার গল্প পড়ুন এখানে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ