অরফিয়াস ও অন্যান্য কবিতা।। orfias and other poems। দ্বীপ সরকার

দ্বীপ সরকার। কবি


দ্বীপ সরকার এর ৫টি কবিতাগুচ্ছ

অরফিয়াস

অরফিয়াস যদি জানতো——আমি বেকার
কবেই ছুঁড়ে ফেলতো আমায়,
বেকার মানেই অদ্ভূদ অভিনেতা
অভিনয় খেলতে খেলতে কখনো
নাট্যমঞ্চ হয়ে ওঠে করতালীর মাঠ,
কখনো, হাসি—দুঃখের, সবুজ ক্ষেত
জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হলে
বেকারত্ব ঢেকে যায়——অনেকটা

এই নাট্যমঞ্চে কখনো একটু হোঁচট খাই,
এলোমেলো গড়মিলে কেঁপে উঠি
দর্শক শ্রোতা বিদ্রুপ ছোঁড়ে
অরফিয়াস, না দেখার ভান করে তখনও

একদিন একান্তে বেলকোনিতে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস গুনছি,
অরফিয়াসের ঘৃণা মিশ্রিত গরম নিঃশ্বাস
বাতাসের সাথে দিয়ে ঢুকে পড়ে বেলকোনিতে
আমি তখন আবেগের ভেতর বহুদূর চলে গেছি
অরফিয়াস একবার হেসে চলে যায়
তার হাসির ভেতর কতো যে অভিজ্ঞতা--
আমি টের পাই

এরপর আরেকদিন আসে, মৃদ পায়ে বেলকোনিতে
আমি তখন আকাশ গুনছি
মেঘে মেঘে কিরুপ আদিখ্যেতা ওদের!
কেউ কাউকে চেনে না
অথচ,পরস্পরে হাত ধরে ভেসে যাচ্ছে,দেশে দেশে
অরফিয়াস অনেক কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারতো,
অথচ জিজ্ঞেস করে না——
আমার পেশা কী?
আমি কি করি——
এসব টেসব

একদিন, পৃথিবীতে যখন সন্ধ্যা নামবে ভাব
বেলকোনিতে ডেকে হাতটা চেপে ধরে বলে,
বাইরে গেলে “চা” খাই কি না?
আমি শুকনো ঠোঁটে বলেছিলাম——“খাই”
তারপর বলেছিলো, দুপুরে কি খাই?
আমি বলেছিলাম—— “মাংস আর ভাত”
তারপর বলেছিলো,অফিসের বেলকোনিতে প্রজাপতি আসে কি না?
আমি তখনও একরাশ মিথ্যা মেখে বলেছিলাম
একদিন এসেছিলো——তার নামটাও “অরফিয়াস”


আমার পা দুটো মরে গেছে

ইজি চেয়ারে বসে আছি, পা ঝুলে
দুই পায়ে ভিড় করছে মাছির দঙ্গল
ভিন ভিন করে উড়ছে, পড়ছে
পা দুটো একেবারেই নাড়াচ্ছি না
ভাবছি, আমার পা দুটো মরে গেছে

আমাদের চৌধুরানীর দক্ষিণ পাড়ে
কিছুদিন আগে দেখেছিলাম একটা গরু মরে আছে
পেট ফুলে হয়েছে মাতুলের মতোন সুন্দর
অসংখ্য মাছি উড়ছে পড়ছে
কিছু মাছি, পেট ফুঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকেছে
মাছিদের পায়ে দৌড়োচ্ছে দুর্গন্ধময় বাসনা
মৃত গরুটির, কষ্ট নেই
গরুটি,উপভোগের দরজা খুলে আনন্দ পাচ্ছে

আমার, পা’দুটোতে জীবন নেই
তাই তো মাছিরা ভিন ভিন শব্দে
দলবেঁধে মণিমুক্তো কুড়োচ্ছে
একটা মাছি আমার কানে ফিসফিসিয়ে বললো,
“আপনার পা তো জীবিত,
একটা নাড়ান দিলেই ভয়ে পালিয়ে যাইতাম”

মাছি জানে না——
পা আমার, বাঁচার মতোন ভান করে আছে
আমার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে


আবু বক্কর স্যার

একদিন আবু বক্কর স্যার ক্লাসে ঢুকেই
আমার পিঠে বেতাতে শুরু করলেন——
তখন সবে মাত্র ওই স্কুলে আমার পদচারণা
ক্লাস ফোর কি ফাইভ হবে
স্যার বেশ কয়েকবার, বেত—পিঠ করার পর
চোখে আগুন ধরিয়ে বললেন,
“ক্লাসে শিক্ষক ঢুকলে দাঁড়াইতে হয় তুই জানিস না বেয়াদব?”

সাথে সাথে সাদা শার্টে, পিঠের ওপরে
লালা টুকটুকে একটা দাগ, রক্তজবার মতোন ফুটে উঠলো
যেখানে ছিঁড়ে গেছে,
ওখানে আমার শ্যামলা রঙের পিঠ দেখা যাচ্ছে

মা অথবা বাবা——কাউকে বলানি সেই কথা

ছেঁড়া শার্ট একদিন তুঘলকি কান্ড ঘটিয়েছে——
হেমন্তের এক শুক্কুরবারে শার্টটি ধোবে বলে
বাথ রুমে নিয়ে যায় আমার মধ্যবয়েসী মা
অতঃপর চোখে ধূলো দিয়ে মায়ের অগোচরে শার্টটি
হেঁটে হেঁটে আমার কাছে এসে বলে,
“তোমার পোষা স্মৃতিকে  মা’কে দেখাতে চাও?”
আমি বলেছিলাম, “না”

মা আমার তন্নতন্ন করে খুঁজে চলে——আমার সেই শার্ট

আবু বক্কর স্যার এখনো যায় আসে
পথে দেখা হলে,মাথা নুইয়ে কদমবুচি করি
স্যার,পান খেকো ঠোঁটে চকচক হয়ে ওঠেন

ঈদ, জাগরণ আর পতন

এক দিকে পতন, এক দিকে জাগরণ
এক দিকে শিমুলের রেণু পড়ে আছে সুন্দর মতোন
আরেক দিকে,আতর সুরমার বেশুমার ওড়াউড়ি


এবারের ঈদ যে কেনো বসন্তে আসলো
পতনের মর্মরে বেজে উঠলো ঈদের ধ্বনি
পতনে পতনে যেখানে দুঃখ,সেখানে কেন যে উৎসব!
যেখানে,হাহাকার—সেখানে কেন যে হুল্লোর!

আমার উঠোনে,পাটিসাপ্টার মতোন পড়ে আছে আমের মোল
সেমাই মিঠার ঘ্রাণ ফিসফিস করছে চারপাশটায়
আমি আর সাদিক, রঙিন হয়ে চবি তুলছি বাগানে

মাইকের ধ্বণিতে আমরা ভেসে যাচ্ছি পুলকে
ছেলেপুলে, টুকটুকে মুখে হাসি ফাটাচ্ছে
ঈদের মাঠে শিমুলের ডালগুলো ঝাঁটা হয়ে
তারাও কম হাসি ফাটাচ্ছে না

আতরবিক্রেতা

মা,বলছে
“বাবা আজকে কবিতা টবিতায় হাত নিস না,
সারাদিন খালি আতর বেচবি”

আমি আতর বেচতে শুরু করি——
এই আতর নিবি, আতর

আতর ছুঁটোছুটি করছে, হাটের ভেতর, সদাই ক্রেতাদের মতোন
কিরুপ সুঘ্রাণ আর মৌ মৌ!
নাকের সড়কে কিরুপ তাদের দৌড়!

এই আতর নিবি আতর
কাঁচাবেলি,জুঁই,আম্বার—দেশি বিদেশি. সব

দেখি, আতরের চঞ্চল পা’গুলো আমার পাঞ্জাবির
ভাঁজে ভাঁজে তিড়তিড় করে ছুটছে

লোকজন আতরের বদলে আমাকে কেনার প্রস্তাব করে——
আমি নাকি রুপোলি চাঁদের মতোন দেখতে
একজন তো বলে ফেললো,
আপনাকে সাদা পাঞ্জাবিতে মানিয়েছে বেশ
বড় মসজিদের ইমামের মতোন রোশনি আছে চেহারায়

আমি রুপান্তরিত হয়ে গেলাম আতরে——খুব গোপনে,

এক বোতল আতরের ভেতর
আমার ‘কিছুটা আমি’ মিশিয়ে দেই
তারপর ফের হাঁকলাম,
কে আছেন,আমাকে কিনবেন,আমাকে
এক সিসি আমি= মাত্র বারোশ টাকা
পর্দার আড়াল থেকে এক রমণী বললো,
——আমি আপনাকে কিনতে চাই
আমি তাকে ছোট্ট এক সিসিতে ‘আমি’কে পুরিয়ে দিলাম


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ