“ঝাউপাতার ঝাঁপতাল” বৈচিত্রময় কবিতার ইঙ্গিত
দ্বীপ সরকার
কবি জিল্লুর রহমান শুভ্রকে যতই পড়ছি ততই বিস্মতি হচ্ছি। এত গভীর থেকে কবিতাকে তুলে এনেছেন যা পাঠককে দুই একবার ভাবনার অতলে নিপতিত করে। তার চিন্তাশক্তি,ভাষাকে খুঁড়ে খুঁড়ে গভীর থেকে তুলে আনার যে কৌশল—তা কবিকে স্বাতন্ত্রবোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। কবিতার ভাষা যখন কেন্দ্রে থাকে, তখন সেই কবিতা রুপ শ্রীতে অনন্য ভুমিকা রাখে। ভাষা আর ভাব মিলে যে অলংকার আবিস্কার হয় সেটাই স্রেষ্ট কবিতা। সেক্ষেত্রে কবি কিছুটা আড়ালের আশ্রয় নিলেও তা গন্তব্যহীন পথ চলা নয়। ঠিক এরকম কবিতার বই “ঝাউপাতার ঝাঁপতাল”। বইটি প্রকাশ করেছে “পুন্ড্র প্রকাশন” অমর একুশে বইমেলা/২০২৪। প্রচ্ছদ করেছেন অরণ্য প্রভা। উৎসর্গ করেছেন এমন একজন অচেনা অজানা বৃদ্ধলোককে যিনি কোন এক পরিস্থিতিতে কবিকে কবি হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। বইটির মুল্য রাখা হয়েছে ২৫০ টাকা।
বইটির মলাট খুললে প্রথমেই চোখ পড়ে মুখবন্ধের দিকে। পশ্চিমবেঙ্গর কবি তৈমুর খান লিখিত মুখবন্ধে বিস্তর আলোচনা করেছেন যার মুল বিষয়বস্তু “কবিতার ঝাঁপতাল” কেমন ভাষা ভাবনার কাব্য— যা পাঠকের জন্য অগ্রীম আভাস হিসেব কাজ করবে। বইটিতে অসংখ্য চিত্রকল্প,অলংকার,নতুন ও অভিনব শব্দের ব্যবহার, বাস্তব আর পরাবাস্তবের সংমিশ্রণে কবিতাকে উন্নতির শিখরে নিয়ে গেছেন। প্রত্যেকটি কবিতা মুল কেন্দ্রে স্থির থাকেনি, কখনো তার ভাব এবং অর্থ ব্যক্তি কেন্দ্রিক আবার কখনো তা ব্যক্তি থেকে বৈশ্বিক হয়ে উঠেছে। এটাই কবিকে প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞ কবি হিসেবে চিহ্নিত করে। এরকম অনেক কবিতা আছে তা থেকে কিছু উদ্ধৃতি পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
“চোখ তার কোনো এক প্রাচীন শহরে কুয়াশার ভেতর
ভোরের স্নিগ্ধ আকাশ—তার ইশারায় গন্ধমৃগ পথ হারায়,
বাস্তবতা ডিগবাজি খায়; টলোমির ভেড়া খেতে আসে”
(কবিতা,এসা হে সুন্দর)
কবিতার সূচনাতেই “চোখ” একটি স্মৃতিবিধুর উপমা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছ। “কোনো এক প্রাচীন শহরে কুয়াশার ভেতর” এর উল্লেখ চোখকে একটি ঐতিহাসিক মিথলোজিকাল রূপ দিয়েছে। প্রিয়সীর চোখকে কুয়াশার ভেতর অস্পষ্ট,ঝাপসার মতো প্রাতিশ্বিকতার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে প্রিয়ার চোখের আকর্ষণে গন্ধমৃগ বা হরিণও পথ হারায়। আকর্ষণ এতটাই প্রকট যে বাস্তবতা ডিগবাজি খায়। টলেমির ভেড়া এখানে একইসঙ্গে মিথ এবং বাস্তবতার পরিশেষ হিসেবে চিত্রায়িত হয়েছে। এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও দার্শনিক অভিজ্ঞতার ফসল —যা কবির ভেতরে সব সময় অনুর্ণিত হয়।
“সমাজের কোন ব্যধির হাতুরির নিচে চূর্ণ হলো তার
স্বপ্নঘ্রাণ? সে বোঝে না ম্যনিফেস্টো, মার্কসের
কাস্তে কিংবা গণতন্ত্রের কঙ্কাল—বোঝে শুধু কলাপাতায়
দু মুঠো ভাতের ধোঁয়াশা আদর আর মেনিমুখো সন্ধ্যা।
আজ কেন তার সন্ধ্যা ক্ষতবিক্ষত হলো অজস্র নাপাম
আর অ্যাটমে? জানে না সে ইউক্লিডের জ্যামিতি”
(কবিতা,সখিনা বেগম)
একটি মায়ের সামাজিক দুঃখ দুর্দশার যে চিত্র— তাই গভীরভাবে ফুটে তুলতে চেয়েছেন কবি। কবিতার মুল কেন্দ্র সখিনা বেগম—এটা একটা প্রতীকী নাম। এখানে দারিদ্রতা,দুঃখ,অশিক্ষিত মায়ের যে সামাজিক অমর্যাদা—তার প্রতি কবি স্বকন্ঠে ধিক্কার জানিয়েছেন। সখিনারা মার্কসবাদ বোঝেন না,গণতন্ত্র বোঝেন না,তার শুধু কলাপাতায় দু’মুঠো ভাতের অপেক্ষায় থাকে। তাদের ক্ষতবিক্ষত হৃদয় ইউক্লিডিও জ্যামিতিতে কখনো ধরা পড়েনা। এখানে নাপাম, ইউক্লিডের জ্যামিতি—এই একক শব্দ এবং সমাসবদ্ধ শব্দ কবিতাকে সুন্দর্যমন্ডিত করেছে। এরপর আরেকটি উদ্ধৃতির দিকে চোখ দেয়া যাক।
“এরপর ভগ্ন হৃদয়ে টলেমির দেয়া ঘড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম মানুষ
হত্যার মহান শিল্পী (?) চেঙ্গিস খানের দরবারে—তাকে উপহার
দিতে। রক্ত পান করতে করতে শালা এতটাই মাতাল ছিল
কাউকে না পেয়ে আমাকেই ধরে ফেলে। কোনোরকমে বেঁচে ফিরি”।
(কবিতা,সময়ের সওয়ার)
কবিতার প্রথম পঙক্তিতে “এরপর ভগ্ন হৃদয়ে টলেমির দেওয়া ঘড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম” অংশটি পাঠককে একটি অতীতের স্মৃতি ও বেদনার সঙ্গে যুক্ত করে। কবি এখানে প্রতীকী চরিত্রের ভুমিকায় থেকে বলতে চেয়েছেন,অনেক বেদনাবিধুর পরিস্থিতিতে টলেমির ঘড়ি নিয়ে চেঙ্গিস খানের দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন। টলেমির ঘড়ি একটি বস্তু হলেও এটি শাসক ও প্রজার মধ্যে সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে এসেছে। কবি নিজেকে মানুষ হত্যার কারিগর চেঙ্গিস খানের দরবারে উপস্থিত হয়ে টলেমির ঘড়ি উপহার দিতে চেয়েও তার ফল উল্টো হয়ে যায়। মাতাল ও রক্তপিপাসু চেঙ্গিস খানই কবিকে আক্রমন করে। এখানে হিংস্র শাসক আর সরল সহজ প্রজার মধ্যে সহজাত চরিত্র সাংঘাতিকভাবে চিত্রিত হয়েছে। এখানে চেঙ্গিস খান এক প্রতীকী চরিত্র হিসেবে আসলেও ইতিহাসের নির্মমতা এবং ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষদের নির্দয়তার প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিছু কবিতা অতি সরল,শব্দের ঘনঘটা নাই,সেখানে ভাব এবং ভাষা’ই মুখ্য অলংকার। এমন একটি উদ্ধৃতির দিকে চোখ দেয়া যাক।
“আজ আমার মা নেই, তোমারও; কীসের ভয়?
কলতলায় আর আসো না। যদিও বা আসো
ঘোমটা পরে থাকো। তবে আমাদের প্রেমবেলা
কি কেবলই কুহকময়”?
(কবিতা.কুহক)
“আজ আমার মা নেই, তোমারও; কীসের ভয়?”—এই পঙ্ক্তিটি দিয়েই কবি পাঠককে একটি মানসিক চাপে ফেলেন। না প্রেমিকের মা আছে না প্রেমিকার মা আছে। দু’জনই অনাথ। তাই কবি প্রশ্ন করেন—“কীসের ভয়?” অর্থাৎ মা না থাকলেও ভয় যায়নি। এখানে সামাজিক অনুশাসন, বিধি নিষেধের অন্তর্গত সংকট ফুটে উঠেছে। পরের পঙক্তিতে বলেন “কলতলায় আর আসো না।” কলতলা আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় গোপন সাক্ষাৎ, নিম্নস্বরে কথা বলা ও আড়াল করা ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। এটি নিছক শুধু কলতলায় উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ নয় বরং প্রেম আর গোপন আনন্দের বিষয় হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। এখানে কলতালা,প্রেমবেলা শব্দ দুটো কবির স্বাতন্ত্রবোধ,শব্দচয়নের প্রতিভাস হয়ে উঠেছে। কবিতার ভাষা যখন বিভিন্ন প্রশ্ন তুলতে শিখে তখন সে কবিতা—কবিতার মানদন্ডে ঐশ্বরিক ক্ষমতা লাভের মতো। সেরকম একটি উদ্ধৃতি—
“তুর পাহাড়ে আল্লাহ বাতাস খাচ্ছেন
দৃম্যটি কল্পনা করুন মুসা নবির মতন।
প্যাপিরাস পরিনত হচ্ছে ইতিহাসের মন্ডে
দৃশ্যটি কল্পনা করুন হেরোডোটাসের মতন”।
(কবিতা,দৃশ্যের আড়ালে)
এখানে কবি আল্লাহ,ধর্ম,ইতিহাস বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ভাব এবং দর্শনকে উপস্থিত করেছেন। “তুর পাহাড়ে আল্লাহ বাতাস খাচ্ছেন” এখানে আল্লাহ আদৌ বাতাস খান কি না,তিনি কি করেন—সেটা মানুষের জ্ঞানের বাইরে থাকে। অথচ কবি বলছেন “দৃশ্যটি কল্পনা করুন মুসা নবির মতন।” এখানে তুর পাহাড় সরাসরি হজরত মুসা (আ.) এর সঙ্গে আল্লাহর কথোপকথনের ঐতিহাসিক-ধর্মীয় ঘটনার মিথ। ঠিক সেভাবে মানুষকেও আল্লাহকে খুঁজতে বলেন কল্পনার মাধ্যমে। কবি এখানে দর্শন স্থাপন করতে চান এভাবে—কল্পনা আর ঐশী কোনটাই কম নয়। মুসা নবির ঐশী আর মানুষের কল্পনা। মানুষ কল্পনাতেও আল্লাহকে খুঁজে পেতে পারে। পরের লাইনে বলেন “প্যাপিরাস পরিনত হচ্ছে ইতিহাসের মন্ডে” এখানে প্যাপিরাস হলো প্রাচীন লেখনসামগ্রী—ইতিহাসের আদিম দলিল—যা ইতিহাসের মণ্ডে পরিণত হচ্ছে ধীরে ধীরে। এটা একটা দৃশ্যকল্প হিসেবে কবি মানুষকে আহবান করেন “কল্পনা করুন হেরোডোটাসের মতন”। হেরোডোটাস, যাকে ‘ইতিহাসের জনক’ বলা হয়। তার দৃষ্টিভঙ্গি এখানে যুক্ত হয়েছে—ঘটনাকে কেবল বিশ্বাস নয়, পর্যবেক্ষণ ও বর্ণনার মাধ্যমে ইতিহাসে রূপ দেওয়ার প্রতীক হিসেবে। এখানে অভিনব শব্দ ‘মন্ডে’র প্রয়োগ কবির বৃদ্ধিদীপ্ত ও দক্ষতার ইঙ্গিত বহন করে।
“কার আঙুলের অদৃশ্য ইশারায় কেটেকুটে ভুল বানানে
লেখা হচ্ছে আমার জীবনী,কে জানে!
পাঠকরা পা ঘষটাবে আর মুখ ভেংচাবে বাঁদরের মতো”
(কবিতা,আগুনে পুড়ে হয়েছি আগুন)
এখানে মূলত অসহায়ত্ব, নিয়ন্ত্রণ হারানো আর বিদ্রূপ—এই তিনটার একসাথে বিস্ফোরণ। কবির দুঃখ বিরহ,না পাওয়ার হতাশা যেমন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে,বিপরীতে অবহেলা বিদ্রুপের টিপ্পনি। “কার আঙুলের অদৃশ্য ইশারায়” এখানে এক অদেখা শক্তির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে—যাকে কবি না পাওয়ার হতাশায় পুড়ে পুড়ে খাক হচ্ছেন। কবি জানেন না কে চালাচ্ছে তাকে,কার অদৃশ্য ইশারায় তার জীবনী লেখা হচ্ছে। অন্য কেউ লিখছে, তাও বিকৃত করে, ভুল বানানে। এটা শুধু ভুল নয়—অবহেলা। মানে, যার জীবন লেখা হচ্ছে, তার মর্যাদাটাই গুরুত্ব পাচ্ছে না। একরকম দীর্ঘশ্বাস— প্রশ্ন নয়, বরং মেনে নেয়া। “পাঠকরা পা ঘষটাবে আর মুখ ভেংচাবে বাঁদরের মতো” ভয়ংকর ব্যঙ্গাত্নকভাবে বলতে চেয়েছেন—তার ভুল বানানের জীবনী মানুষ পড়ে নগ্নভাবে পা ঘষটাবে। পাঠক মুলত সমাজ, মানুষ, দর্শক। এই কবিতাতেও ‘ঘষটাবে’ শব্দটায় আঞ্চলিকতার আভাস পাওয়া গেলেও তা কবিতাকে মন্ডিত করেছে। এটাই কবির স্বাতন্ত্রতা।
একজন কবির একটি বা দুটি লেখা পড়ে নিশ্চিত হওয়া যায় না তিনি কতটা পারঙ্গম কবি। কবির অভিজ্ঞতা এবং তার চিন্তার গভীরতার মাপজোখ করতে হলে তাকে পড়তে হবে। আমি জিল্লুর রহমান শুভ্র’র দুটি কবিতার বই যথাক্রমে “দেহখানি তার চিকন চাঁদ” এবং “ঝাউপাতার ঝাঁপতাল” পড়ে অভিভূত হয়েছি। সেরকম আপনার উপলব্ধিতেও যোগ করতে পারেন এই দুটি কবিতার বই। হতে পারে অন্যভাবে অন্য অর্থ নিয়ে আপনার নিকটে আবিস্কৃত হতে পারে। ভিন্নস্বাদের রস রসায়নে আপনিও মুগ্ধ হবেন—এমন আশা করতে পারি।
আরো পড়ুন...
অন্ধ আয়নার গল্প পড়ুন এখানে
মেডিকেল ও কাঁটাপাথর এখানে পড়ুন
গোলাম কিবরিয়া পিনু'কর্মকান্ড নিয়ে বিন্তর আলোচনা পড়ুন
৫টি কবিতা পড়ুন এখান
সোনালী কাবিন পাঠ আলোচনা এখানে
পাঁচটি কবিতা পড়ুন
ঝাউপাতার ঝাঁপতাল এখানে পড়ুন
ছবি আর্কাইভ ১ দেখুন
দেহখানি তার চিকন চাঁদ এখানে

0 মন্তব্যসমূহ
ধন্যবাদ আপনাকে