কবি দ্বীপ সরকার এর কবিতা
আবু আফজাল সালেহ
দ্বীপ সরকার। প্রকৃতনাম শহিদুর রহমান। তবে ছদ্ম নামেই লেখালেখি করেন। ১৯৮১ সালের ১ মার্চ তিনি বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার কবিতার বই ৩টি। ‘ভিন্ন ভাষার গোলাপজল’ ও ‘ফিনিক্স পাখির ডানা’ অন্যতম দুটি কবিতার বই। ‘কুয়াশা’ লিটলম্যাগের সম্পাদক তিনি।
‘নির্জনতার বাঁকে কিছু অন্ধকার ঘাপটি মেরে আছে জেনেও আমি ছুটছি সিধে পথে, একটু নিরোপেক্ষ হতে শেখো (সাউন্ড অব স্কাই)’, ‘এসো প্রকৃতি চেনার গল্প বলি—প্রকৃতি চিনলে মানুষ চেনা যায় (থিসিস)’, ‘চোরাবালি কান্না (মানচিত্র ঘুমালে)’ ইত্যাদি বক্তব্যের মাধ্যমে চেনা-পৃথিবীর অন্ধকার ও হতাশাজনক অধ্যায়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আধুনিক যুগের কবিতায় হতাশা, অপুর্ণতা থাকবেই। দ্বীপ সরকারের কবিতাতেও এ প্রবণতা রয়েছে। আরও কিছু উদাহরণ—
(১) ‘মন বলে ফিরে আসুক—আমি বলি না আসলেই ভালো;
চোখ বলে ফিরুক—আমি বলি অন্য কথা
সে ফিরুক অথবা না ফিরুক সে কাঁদুক অথবা না কাঁদুক’
(দ্বিচারিতা)
(২) ‘বদলী বিষয়ক প্রজ্ঞাপনে মনকথা উল্লেখ নেই।
বদলী হতে হতে একদিন প্রতিবাদী দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে মনগাছ|’
(মনগাছ)
(৩) ‘একটা গভীরতা ছুঁয়েই দুঃখসমূহ বুদবুদ করে-
তবে উনুনে বসা তহমিনা খাতুন উত্তর দিয়েছিলেন
পাখিরা যেমন বনে সুন্দর, কষ্টেরা বুদবুদে|’
(বুদবুদ)
(৪) ‘দয়িতার নাটকে ধর্মের জয় দেখে অধর্মের চোরাবালি কান্না।
...এমনটাই ভাবি এখন। মানচিত্র ঘুমালে
এমন ভয়াল বেড়াল ঝাঁপিয়ে পড়ে কিনা।
একাত্তরে যেমন মানচিত্রকে ঘুমাতে দেয়নি কেউ কেউ....’
(মানচিত্র ঘুমালে)
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে জানতে হলে কৃষকের কাছে যেতে হবে। ধান প্রতীকী হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে :
‘কাউনের ফুল থেকেও ভাতের ঘ্রাণ পাও
ধানফুল থেকেও পাও
জীবনের ঘ্রাণ ওখানেই।
... জীবন জীবন খেললে ভোরের মাঠে আসী,
ধানের কাছে খেলা শিখি--ধান খেলা শেখায়,
ভাতকুমারিদের চেখে চেখে মাঠে শক্তি বাড়াই’
(ভাতকুমারি)
গদ্যকবিতার ক্ষেত্রেও তিনি বেশ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। দুটি উদাহরণ।
(১) ‘শুক্রবার আসলে পত্রিকার সাহিত্যপাতাগুলো ঝকমকি আলো ছড়ায়। ভাঁজ খসালে কবিতার পা
আস্তে আস্তে পৃথিবী দেখে-যেমন পৃথিবী দেখে ভূমিষ্টরত সন্তান।'
(শুক্রবার)
(২) ‘মেঘের ডিঙি সাঁতরাচ্ছে আকাশে-বেহিসেবি,
শাঁই শাঁই কাশফুল। উজান দিকের লিপিস্টিক
পড়ুয়া হাওয়া-
চুম্বণ নেয়া শেষে ফের গাভিন হওয়ার গল্প; গাভিন দুপুর, গাভিন ভোর’
(শরৎ ও হিমাংশু সরকার)
চিত্র, উপমা বা চিত্রকল্পের ব্যবহারে বেশ ভালো দক্ষতা দেখিয়েছেন। ‘আগুণের ছুরি’, ‘মেঘের ডিঙি সাঁতরাচ্ছে আকাশ’, ‘বাঁধাকপির খোপে পড়ে আছে সরল কুয়াশা’, ‘মৌনতাকে ছিঁড়ে আঁকড়ে ধরে আছে হিমবাতাস’, ‘নাভীর নীচে লম্বাটে খেকশিয়ালের মোচ’, ‘বাদাম চেরা স্তন’, ‘চিত্রানদীর জোসনা’ ইত্যাদি উপমা, শব্দব্যবহার (ক্ষেত্রমতে চিত্রকল্প-নির্মাণ) আমার কথার সপক্ষে প্রমাণ দেওয়ার জন্য নমুনা বলেই মনে করি। এসবের ক্ষেত্রে নতুন নতুন রুচিকর অবস্থাও উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করি। যেমন—
‘টেবিলের ড্রয়ার খুললে প্যারাসিটামল হেসে উঠে বলে, ‘‘আমাকে খাও’’|
আমি খাই। আমি মূলত প্যারাসিটামল খাইনা—খাই তার হাসি।
এভাবে কয়েকদিন খেতে খেতে আমার রোগ সেরে গেলো।
ড. বললেন, ঔষধের চেয়ে হাসিতেই রোগ সারে বেশি।'
(হাসি)
দ্বীপ সরকারের কবিতার বাংলাসাহিত্যে অবস্থানগত আলোচনার সময় এখনও আসেনি। তবে ভোরের আলো দেখে যেমন দিনের আগাম আন্দাজ করা যায়, তেমনি তার কবিতা দেখে আলোর ঝলকানি দেখা যায়। কিছু সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বাংলা কবিতাজগতে তিনি হতে পারেন মূল্যবান এক নাম। সে আশার কথা আমরা তার কবিতায় দেখি। দ্বীপ সরকারের কবিতার ক্রমবিকাশ লক্ষণীয়। পর্যায়ক্রমিক ক্রমবিকাশের কবিতা আমাদের মনে আশার সঞ্চার করে। প্রমিত বানানে আরও লক্ষ্য রাখতে হবে।
শুভেচ্ছান্তে,
আবু আফজাল সালেহ
কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, চুয়াডাঙ্গা


0 মন্তব্যসমূহ
ধন্যবাদ আপনাকে